বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৩ পূর্বাহ্ন

খামেনির লাশ ও ৪০ দিনের রহস্য: ধর্মের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়াল কি ক্ষমতার রাজনীতি?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৬ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর আজ ৪০ দিন অতিক্রান্ত হতে চলেছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী মৃত ব্যক্তিকে দ্রুত দাফন করার নিয়ম থাকলেও, ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির মরদেহ এখনো মাটির স্পর্শ পায়নি। এই দীর্ঘ বিলম্ব কি কেবলই ‘জনতার চাপ’ সামলানোর প্রস্তুতি, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ক্ষমতার লড়াই?

দাফন বিলম্বের ‘অযৌক্তিক’ অজুহাত

ইরানের ‘ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট কোর্ডিনেশন কাউন্সিল’ দাবি করেছে, খামেনির জানাজায় নজিরবিহীন জনসমাগম সামলানোর অবকাঠামো তৈরি করতে সময় লাগছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্র নিয়মিত বিশাল ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করে, তাদের পক্ষে ৪০ দিনেও একটি দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য? ধর্মীয় নেতার শেষ বিদায়ে ধর্মীয় বিধান (দ্রুত দাফন) লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই কি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে?

মোজতবা খামেনি: ‘আহত বাঘ’ নাকি উত্তরাধিকারের লড়াই?

খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মোজতবাকে নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত। তিনি তার পিতার সাথেই থাকতেন এবং হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। ইরান তাকে ‘জখমি বুবার’ বা আহত বাঘ হিসেবে অভিহিত করলেও পশ্চিমা গণমাধ্যম বলছে তিনি কোম শহরের একটি হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।

  • কৌশল: ইরান কি মোজতবার সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছে? যাতে তিনি নিজেই তার পিতার জানাজায় নেতৃত্ব দিয়ে নিজের বৈধতা ও ক্ষমতা জাহির করতে পারেন?

 জানাজা কি ‘ডেথ ট্র্যাপ’?

যুদ্ধের এই উত্তপ্ত সময়ে খামেনির জানাজা হতে পারে ইসরায়েলের জন্য একটি বড় লক্ষ্যবস্তু। কারণ সেখানে ইরানের শীর্ষ সামরিক জেনারেল, রাজনৈতিক নেতা এবং ধর্মীয় প্রভাবশালীরা একসাথে উপস্থিত থাকবেন। এই নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে একসাথে ‘একই ফ্রেমে’ আনা থেকে বিরত থাকতেই হয়তো দাফন প্রক্রিয়া বারবার স্থগিত করা হচ্ছে।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও লাশের ছবি

খামেনি ছিলেন ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার মেরুদণ্ড। ইরান সম্ভবত চায় না তাদের সর্বোচ্চ নেতার নিথর দেহের ছবি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ুক, যা জনগণের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। খামেনি নিজেই যে ‘চার স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ তৈরি করেছিলেন, তার মাধ্যমেই শীর্ষ নেতারা মারা গেলেও ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নেতার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর যে ‘ক্ষমতার শূন্যতা’ তৈরি হবে, তা সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ইতিহাসের দীর্ঘতম প্রশ্ন

ইসলামি প্রজাতন্ত্র হওয়ার পরেও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দাফনে ৪০ দিনের বিলম্ব ইরানের ইতিহাসে একটি কালো দাগ হিসেবে থেকে যাবে। যুদ্ধবিরতির গুঞ্জনের মাঝে হয়তো খামেনির লাশ শেষ পর্যন্ত মাটি পাবে, কিন্তু মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা এবং ইরানের আগামীর নেতৃত্ব নিয়ে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তা মাটির নিচে ঢাকা পড়বে না। খামেনির লাশ ঘিরে চলা এই রাজনীতি আসলে ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়েরই এক প্রতিচ্ছবি।


এ জাতীয় আরো খবর...