মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ এখনো যায়নি, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্য থেকে আসা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবরটি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তবে এই চুক্তিকে কেবল ‘বিরতি’ হিসেবে দেখতে নারাজ তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (SNSC) অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত ইরানের ১০ দফা দাবির কাছে নতিস্বীকার করেছেন। এটিকে ইরানের আধুনিক ইতিহাসের বৃহত্তম ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার অনেক আগেই তেহরান তার অবস্থান স্পষ্ট করেছিল এবং ট্রাম্পকে তাদের শর্তাবলীতে রাজি হতে বাধ্য করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনার টেবিলে ইরানের এই ‘আপার হ্যান্ড’ বা সুবিধাজনক অবস্থান পাওয়ার পেছনে কয়েকটি কৌশলগত কারণ রয়েছে:
আগাম সম্মতি: ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই তেহরানের সম্মতি প্রমাণ করে যে, আলোচনার মূল সূত্রগুলো তেহরান থেকেই নির্ধারিত হয়েছে।
কৌশলগত ব্ল্যাকমেইল: হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকির মুখে বিশ্ব অর্থনীতির যে নাজেহাল অবস্থা হয়েছিল, তা ট্রাম্পকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে।
আল-জাজিরা ও তেহরান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ১০টি দাবির প্রতিটি পয়েন্ট মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের মূলে কুঠারাঘাতের সমান:
১. হরমুজ প্রণালিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ: ইরান দাবি করেছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনো আন্তর্জাতিক জাহাজের চলাচল এখন থেকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ‘নিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণ’ এবং ‘নিরাপদ ট্রানজিট প্রোটোকল’-এর অধীনে থাকবে। এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি তেলের প্রধান রুটটির নিয়ন্ত্রণ সরাসরি তেহরানের হাতে ন্যস্ত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
২. আন্তর্জাতিক নৌ-যাতায়াতে নিজস্ব প্রোটোকল: হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী সকল বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের জন্য ইরানের নিজস্ব ‘নিরাপদ ট্রানজিট প্রোটোকল’ মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি কার্যকর হলে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে ইরানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হবে।
৩. মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার: পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল যুদ্ধকালীন ঘাঁটি এবং সেনা মোতায়েন কেন্দ্র থেকে মার্কিন সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান। এটি মূলত এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির চিরস্থায়ী অবসান ঘটানোর একটি শর্ত।
৪. মিত্র শক্তির নিরাপত্তা ও হামলা বন্ধ: ইরান স্পষ্ট করেছে যে, কেবল তাদের ওপর নয়, বরং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। এটি মূলত হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতিদের ওপর যে কোনো ধরণের মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলা চিরতরে বন্ধ করার দাবি।
৫. সকল নিষেধাজ্ঞা একযোগে বাতিল: ইরানের বিরুদ্ধে থাকা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে এবং একযোগে বাতিল করতে হবে। তেহরানের মতে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের উন্নয়ন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।
৬. জাতিসংঘ ও IAEA-এর নেতিবাচক প্রস্তাবনা প্রত্যাহার: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিচালনা পর্ষদ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অতীতে নেওয়া সকল নেতিবাচক প্রস্তাবনা, নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দা প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
৭. বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ মুক্তি: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভে আটকে থাকা ইরানের সকল রাষ্ট্রীয় অর্থ, সম্পদ ও সম্পত্তি কোনো শর্ত ছাড়াই অবিলম্বে তেহরানের ভল্টে ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
৮. যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ক্ষতিপূরণ: বিগত বছরগুলোতে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে সৃষ্ট বিশাল ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ক্ষতিপূরণ’ প্রদান করতে হবে। এটি মূলত ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের একটি শর্ত।
৯. আন্তর্জাতিক আইনি ও বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা: সমঝোতা হওয়া প্রতিটি বিষয়কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি ‘বাধ্যতামূলক রেজুলেশন’ হিসেবে পাস করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা অন্য কোনো মার্কিন সরকার একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে সরে আসতে না পারে।
১০. ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ ও ফিলিস্তিন সমাধান: গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও আগ্রাসন চিরতরে বন্ধ করতে হবে। একই সাথে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি প্রদান করার দাবি জানিয়েছে ইরান।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের মতো একজন হার্ডলাইনার প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া মানে হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের সূর্যাস্ত। যদি এই ১০ দফার অর্ধেকও কার্যকর হয়, তবে ইরান এই অঞ্চলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হবে। তবে ওয়াশিংটনের ভেতরের একটি অংশ দাবি করছে, এটি কেবল একটি ‘সাময়িক কৌশল’ হতে পারে।