শিরোনামঃ
খালেদা জিয়ার পক্ষে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন জাইমা রহমান কর কাঠামোতে সারচার্জ বাতিল করে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা দেশে হাম পরিস্থিতির চরম অবনতি: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর প্রাণহানি হজের প্রথম ফ্লাইট শুক্রবার দিবাগত রাতে সংশোধনের মাধ্যমে শিগগিরই চূড়ান্ত হচ্ছে সম্প্রচার নীতিমালা: পে-চ্যানেল হবে বেসরকারি টিভি দিল্লির প্রস্তাব সুকৌশলে ওড়ালেন শেখ হাসিনা দেড় মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ: বিনিয়োগ খরার মুখে বেসরকারি খাত সংখ্যাধিক্যই কি ব্যাংক খাতের প্রধান কাল? ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ: কী, কেন এবং কোথায়? জ্বালানি সংকট: ঢাকা রুটে ফ্লাইট কমাচ্ছে এয়ারলাইনগুলো
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন

ফ্রিল্যান্সারদের এক দশকের আক্ষেপ ঘোচানোর উদ্যোগ: আসছে পেপ্যাল!

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের কাছে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ (PayPal) যেন এক মরীচিকা। বারবার আশ্বাসের বেলুন উড়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা ধরা দেয়নি। তবে এবার আর কোনো ধোঁয়াশা নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে পেপ্যালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও নতুন উদ্যোগ

বুধবার (১৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যালের কার্যক্রম শুরু করতে এরই মধ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি পেপ্যাল চালুর পাশাপাশি দেশের হাইটেক পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলোর কার্যকর পরিচালনা নিয়েও কাজ করছে।

এর আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধার্থে পেপ্যালের মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকার এখন সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কাজ শুরু করেছে।

অতীতের হতাশা: ‘জুম’ দিয়ে ধোঁকা এবং বারবার ব্যর্থতা

বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর আলোচনা শুরু হয়েছিল মূলত ২০১০ সালের পর থেকে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শেষে ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় একটি সেবার উদ্বোধন করেছিলেন। কিন্তু ফ্রিল্যান্সাররা দ্রুতই বুঝতে পারেন, সেটি আসল পেপ্যাল নয়, বরং পেপ্যালের একটি সহায়ক রেমিট্যান্স সেবা ‘জুম’ (PayPal Xoom)। এটি দিয়ে প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে পারলেও, ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্রহণ বা ই-কমার্স ব্যবসার কোনো সুবিধাই ছিল না। পরবর্তীতে ২০২১ সালেও এটি নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

কেন বারবার আটকে গেছে পেপ্যাল?

পেপ্যাল বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে সফলভাবে চললেও বাংলাদেশে এর প্রবেশে মূলত তিনটি বড় বাধা ছিল:

  • দ্বিমুখী লেনদেনে বাধা (Inflow & Outflow): পেপ্যাল শুধু টাকা আনার যন্ত্র নয়, এটি দিয়ে আন্তর্জাতিক কেনাকাটাও করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে দেশ থেকে অবাধে টাকা বাইরে পাঠানোর সুযোগ ছিল না। পেপ্যালের মতো গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মের জন্য এই একমুখী নীতি বড় বাধা।

  • কেওয়াইসি (KYC) ও সেটেলমেন্ট দুর্বলতা: অনলাইনে প্রতারণা বা আর্থিক জালিয়াতি হলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার দেওয়ার মতো ২৪ ঘণ্টার কোনো ‘সেন্ট্রাল ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট সিস্টেম’ আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। পাশাপাশি ব্যবহারকারীর ঠিকানার নির্ভরযোগ্য ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাতেও গলদ ছিল।

  • আঞ্চলিক কার্যালয়ের দীর্ঘসূত্রিতা: আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, পেপ্যালের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ মূলত ভারতের আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির হয়ে পড়ত।

কেন এবারের উদ্যোগ ভিন্ন ও বাস্তবসম্মত?

গত কয়েক মাসে দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এবং পেপ্যাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে:

১. পেপ্যাল টিমের ঢাকা সফর: সম্প্রতি পেপ্যালের দক্ষিণ এশিয়া (সিঙ্গাপুরভিত্তিক) টিমের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে আইসিটি বিভাগ ও ব্যাংকারদের সঙ্গে বৈঠক করেছে, যা অতীতে বিরল।

২. নীতিগত আগ্রহ: ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, পেপ্যাল বাংলাদেশে ব্যবসা করতে ‘নীতিগতভাবে আগ্রহী’।

৩. সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি কমিটি গঠনের ঘোষণা প্রমাণ করে, বিষয়টি এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে আটকে নেই, বরং আইনি ও প্রযুক্তিগত বাধা দূর করে বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার।

কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন? অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের (OII) বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনলাইন শ্রম বা ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। কিন্তু ‘আসল’ পেপ্যাল না থাকায় এখানকার ফ্রিল্যান্সারদের পেওনিয়ার (Payoneer), ওয়াইজ (Wise) বা অন্যান্য থার্ড-পার্টি অ্যাপের ওপর নির্ভর করতে হয়, যার ফি অনেক বেশি এবং লেনদেন সময়সাপেক্ষ। পেপ্যাল চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে:

  • ফ্রিল্যান্সার ও আউটসোর্সিং: ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে দ্রুত, নিরাপদ ও অত্যন্ত কম খরচে সরাসরি পেমেন্ট নিতে পারবেন।

  • ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (F-commerce/E-commerce): দেশীয় হস্তশিল্প, পোশাক বা অন্যান্য পণ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে সহজেই পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন।

  • স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও ক্যাশলেস ট্রানজেকশন বিশ্ববাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার ফলে বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আসার পথ সুগম হবে।

বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পেপ্যাল আসা মানেই বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বৈশ্বিক সেতুবন্ধন তৈরি হওয়া। তবে এটি মনে রাখতে হবে যে, পেপ্যাল তাদের নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা কাঠামো শতভাগ নিশ্চিত না করে কোনো বাজারে প্রবেশ করে না। সরকারের কমিটি গঠন একটি বড় ধাপ হলেও, প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সংস্কারগুলো পুরোপুরি সম্পন্ন করে এটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের হাতে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।


এ জাতীয় আরো খবর...