শিরোনামঃ
খালেদা জিয়ার পক্ষে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন জাইমা রহমান কর কাঠামোতে সারচার্জ বাতিল করে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা দেশে হাম পরিস্থিতির চরম অবনতি: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর প্রাণহানি হজের প্রথম ফ্লাইট শুক্রবার দিবাগত রাতে সংশোধনের মাধ্যমে শিগগিরই চূড়ান্ত হচ্ছে সম্প্রচার নীতিমালা: পে-চ্যানেল হবে বেসরকারি টিভি দিল্লির প্রস্তাব সুকৌশলে ওড়ালেন শেখ হাসিনা দেড় মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ: বিনিয়োগ খরার মুখে বেসরকারি খাত সংখ্যাধিক্যই কি ব্যাংক খাতের প্রধান কাল? ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ: কী, কেন এবং কোথায়? জ্বালানি সংকট: ঢাকা রুটে ফ্লাইট কমাচ্ছে এয়ারলাইনগুলো
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২১ অপরাহ্ন

কর কাঠামোতে সারচার্জ বাতিল করে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

দেশের রাজস্ব আয় বাড়াতে এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও সমতা আনতে ধনীদের ওপর কর কাঠামোগত বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রচলিত ‘সারচার্জ’ ব্যবস্থা বাতিল করে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সম্পদের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। পুরোনো দলিল মূল্যের পরিবর্তে জমির বর্তমান বাজারমূল্য বা ‘মৌজা মূল্য’র ভিত্তিতে এই কর নির্ধারিত হবে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা এবং চট্টগ্রামের খুলশী ও আগ্রাবাদের মতো বিভাগীয় শহরের অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী উচ্চবিত্ত ও সম্পদশালীদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বৈষম্য কমানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এরই মধ্যে এই লক্ষ্যে ‘সম্পদ কর আইন’ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পেলেই এটি আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে।

বর্তমান সারচার্জ ব্যবস্থা বনাম প্রস্তাবিত ‘সম্পদ কর’ বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর (বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট) সম্পদের মোট মূল্য ৪ কোটি টাকার বেশি হলে কিংবা একাধিক গাড়ি বা ৮ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের বাড়ি থাকলে তাকে সারচার্জ দিতে হয়। এই সারচার্জ নির্ধারিত হয় ব্যক্তির দেওয়া ‘আয়করের’ ওপর ভিত্তি করে (১০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত)। যেমন—কারও ৫ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে এবং তিনি বছরে ১ লাখ টাকা আয়কর দিলে, তাকে ওই আয়করের ওপর ১০ শতাংশ, অর্থাৎ মাত্র ১০ হাজার টাকা সারচার্জ দিতে হয়।

অন্যদিকে, নতুন প্রস্তাবিত ‘সম্পদ কর’ ব্যবস্থায় সম্পদের সীমা একই (৪ কোটি টাকা থেকে শুরু) থাকবে, তবে কর গণনার পদ্ধতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। প্রস্তাবিত হারগুলো হলো:

  • ৪ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত: মোট সম্পদমূল্যের ০.৫০%

  • ১০ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত: মোট সম্পদমূল্যের ১.০০%

  • ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত: মোট সম্পদমূল্যের ১.৫০%

  • ৫০ কোটি টাকার ওপরে: মোট সম্পদমূল্যের ২.০০%

করদাতার জন্য ‘সেফটি নেট’ বা সুরক্ষা

তবে নতুন নিয়মে করদাতাদের জন্য একটি স্বস্তির জায়গাও রাখা হয়েছে। খসড়া নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনোভাবেই ‘সম্পদ কর’ ব্যক্তির প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি হবে না।

উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ ৬ কোটি টাকা এবং তিনি বছরে ১ লাখ টাকা আয়কর দেন। নতুন নিয়মে ৬ কোটি টাকার ওপর ০.৫০% হারে তার ৩ লাখ টাকা সম্পদ কর আসার কথা। কিন্তু যেহেতু সম্পদ কর তার আয়করের চেয়ে বেশি হতে পারবে না, তাই তাকে সম্পদ কর হিসেবে শুধু ১ লাখ টাকাই দিতে হবে। অর্থাৎ আয়কর ও সম্পদ কর মিলিয়ে তাকে মোট ২ লাখ টাকা দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় সারচার্জ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

কীভাবে বাড়বে রাজস্ব আয়?

এনবিআর মনে করছে, এই নতুন পদ্ধতি দুটি বড় উপায়ে রাজস্ব বাড়াতে সহায়তা করবে: ১. মৌজা মূল্যের ব্যবহার: বর্তমানে পুরোনো দলিল মূল্যের ওপর ভিত্তি করে সারচার্জ হিসাব করা হয়। ফলে অনেক আগে সস্তায় কেনা বিপুল সম্পদের মালিকরাও করের আওতার বাইরে থাকেন। যেমন: নব্বইয়ের দশকে গুলশানে ৮০ লাখ টাকায় কেনা জমির বর্তমান বাজারমূল্য বা মৌজা মূল্য কয়েক কোটি টাকা। নতুন নিয়মে মৌজা মূল্য হিসাব করায় এই বিশাল সম্পদ করের আওতায় আসবে। ২. ন্যূনতম প্রদেয় কর: আয়করের সমান সম্পদ কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় ধনীদের থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।

উন্নত বিশ্বের চিত্র ও এনবিআরের প্রত্যাশা

এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সম্পদ কর চালু রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স এবং জাপানের মতো দেশগুলো তাদের জিডিপির ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় করে সম্পদ কর থেকে। বাংলাদেশে এই আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ কর আদায় করা সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে। (উল্লেখ্য, বর্তমানে বছরে সারচার্জ আদায় হয় মাত্র ৬০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার মতো)।

বিশেষজ্ঞের মত

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “কর ন্যায্যতার প্রেক্ষাপটে যার আয় ও সম্পদ বেশি, তার করের বোঝাও আনুপাতিক হারে বেশি হওয়া উচিত। সম্পদ কর বৈষম্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “সম্পদের ভ্যালুয়েশন বা মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি যেন স্বচ্ছ ও সর্বজনগ্রাহ্য হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। অন্যথায় জোর করে কর চাপিয়ে দিলে মানুষ সম্পদ গোপনের চেষ্টা করবে, যা অর্থনীতিতে কালো বা অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেবে।”


এ জাতীয় আরো খবর...