দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ-হ্যাভেন’ (Safe-haven) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল মার্কিন ডলার। কিন্তু সেই ডলারের বাজারদর এবার টানা সপ্তম দিনের মতো পতন দেখল। এর পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে দুটি বিষয়—ইরানের সাথে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইতিবাচক ইঙ্গিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি হ্রাসের সুখবর।
সূচক ও মুদ্রাবাজারের বর্তমান হালচাল
আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের এই পতন বেশ স্পষ্ট। বাজার ও অর্থনীতির পরিসংখ্যান বলছে:
ডলার ইনডেক্সের পতন: মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) লেনদেন শেষে বিশ্ববাজারে ডলার ইনডেক্স শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। গত ২ মার্চের পর এটিই ডলারের সর্বনিম্ন মান।
ইউরো ও অন্যান্য মুদ্রার উত্থান: ডলারের মান কমায় স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হচ্ছে অন্যান্য প্রধান মুদ্রাগুলো। ডলারের বিপরীতে ইউরোর দাম শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ১.০৭৯৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ব্রিটিশ পাউন্ড ও জাপানি ইয়েনের বিপরীতেও ডলারের অবস্থান বেশ দুর্বল দেখা গেছে।
দরপতনের নেপথ্যের দুই বড় কারণ
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের এই দরপতনের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় সমীকরণই কাজ করছে:
১. ট্রাম্পের ‘শান্তিবার্তা’ ও মধ্যপ্রাচ্য সমীকরণ: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে আগামী দুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। যদিও গত সপ্তাহান্তের বৈঠকগুলো থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল আসেনি, তবুও নতুন করে আলোচনার খবরে বৈশ্বিক বাজারে এক ধরনের স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে।
২. মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও ফেডের নীতি: যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনীতির ডেটা (Macroeconomic data) বলছে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক কম এসেছে। এর ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ (Fed) খুব শিগগিরই সুদের হার কমানোর পথে হাঁটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতিতে সুদের হার কমলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারের আকর্ষণ কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সূচকে।
বিশ্লেষকদের মত: ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র
ডলারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতি নিয়ে কথা বলেছেন প্রখ্যাত বাজার বিশ্লেষক কার্ল শামোট্টা। তিনি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে একটি ‘এক্সিট র্যাম্প’ (Exit Ramp) বা সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যদি অন্তত একটি ‘প্রতীকী চুক্তি’ও হয়, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। এর ফলে আটকে থাকা ‘হরমুজ প্রণালি’ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করবে এবং হামলা বন্ধে সহায়ক হবে।
আগামীর বাজার পরিস্থিতি: বিনিয়োগকারীদের নজর যেখানে
বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের নজর এখন পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক টেবিলের দিকে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, যদি সত্যিই একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে বাজার থেকে ‘প্যানিক বায়িং’ (Panic Buying) বা আতঙ্কিত হয়ে ডলার কিনে রাখার প্রবণতা পুরোপুরি কমে যাবে। সেক্ষেত্রে ডলারের মান আরও কমে দ্রুতই যুদ্ধপূর্ববর্তী স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।