বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন

বৈশাখের আগে সিন্ডিকেটের পকেটে উৎসবের আনন্দ?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৯ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
hilsa-ইলিশ

বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশের অবিচ্ছেদ্য যুগলবন্দী। কিন্তু উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে সারা দেশেই দেখা দিয়েছে ইলিশের তীব্র হাহাকার। দেশের ইলিশের প্রধান জোগানদাতা চাঁদপুর, বরিশাল ও বরগুনার বড় মোকামগুলো থেকে শুরু করে রাজধানীর বাজারগুলোতেও ইলিশ যেন হঠাৎ করেই সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে পাড়া-মহল্লায় সহজলভ্য ছিল এই রুপালি মাছ, সেখানে এখন বৈশাখ ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম সংকট। সপ্তাহের ব্যবধানে সারা দেশেই কেজিতে ইলিশের দাম বেড়েছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত, যা সাধারণ মানুষের নাগালের পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে।

দেশের ইলিশের মূল সরবরাহ আসে মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে। কিন্তু জোগানদাতা এই প্রধান মোকামগুলোতেই এখন শ্মশানের নীরবতা। ইলিশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চাঁদপুরে সরবরাহের তীব্র ঘাটতির কারণে সারা দেশের খুচরা বাজারগুলোতে রীতিমতো আগুন লেগেছে। অন্যদিকে, বরিশালের বিখ্যাত পোর্ট রোড মৎস্য মোকাম ঘুরে দেখা গেছে চরম হতাশাজনক চিত্র। মোকামে ইলিশের সরবরাহ নেই বললেই চলে। গতকাল সেখানে এক কেজি ওজনের প্রতিটি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৭৫০ টাকায়। আর ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের এলসি সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাগরঘেঁষা বরগুনার সদর, বামনা, পাথরঘাটা ও আমতলীর বাজারগুলোতেও অতীতের যেকোনো বছরের তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। সেখানে এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ইলিশের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে ব্যবসায়ীরা মূলত পয়েন্ট করে দেখিয়েছেন পয়লা বৈশাখের বাড়তি চাহিদা এবং অভয়াশ্রমে দুই মাসের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার কারণকে। বরিশালের পোর্ট রোডের আড়তদার নাসির উদ্দিন জানান, সরবরাহের অভাবেই গত চার দিনে কেজিতে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা দাম বেড়েছে। অন্যদিকে বরগুনার মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানিসংকটের কারণে জেলেরা ঠিকমতো সাগরে যেতে না পারায় জোগান তলানিতে এসে ঠেকেছে। মোকামগুলোতে মাছ না থাকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সারা দেশের খুচরা বাজারগুলোতে।

তবে মৎস্য অধিদপ্তর এই হঠাৎ সংকটকে পুরোপুরি প্রাকৃতিক বা কেবল সরবরাহের ঘাটতি হিসেবে মানতে নারাজ। বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, নদীতে বা বাজারে ইলিশ নেই এমন অজুহাত দেওয়া হলেও এক সপ্তাহ আগেও সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল এবং দামও এত বেশি ছিল না। বৈশাখ ঘিরে অসাধু চক্র কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ীরা মোকাম থেকে কত দামে মাছ কিনছেন আর খুচরা বাজারে কত দামে বিক্রি করছেন, তা কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।

ইলিশের এই তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী দাম সারা দেশের সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করেছে। বরিশালের ক্রেতা মোয়াজ্জেম হোসেন ও শিক্ষিকা আসমা আক্তারের মতো দেশের লাখো মানুষের এখন একটাই আক্ষেপ—কদিন আগেও ভ্যানে করে বিক্রি হওয়া ইলিশ হঠাৎ উধাও হলো কোথায়? যে দাম, তাতে এবার পান্তা-ইলিশ তো দূরে থাক, পান্তা-জাটকাও জুটবে না। বরগুনার শারমিন সুলতানার মতো অনেকেই এখন উৎসবের অপরিহার্য এই অনুষঙ্গ ছাড়াই পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইলিশের এই আকাল যেন সারা দেশের বৈশাখী উৎসবের রঙকেই এবার কিছুটা ফিকে করে দিয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...