দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হতে যাচ্ছে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ (পিইডিপি-৫)। এই কর্মসূচির আওতায় দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবশিষ্ট শিক্ষকদের ইংরেজি বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে থাকা উপকূলীয় এলাকার সুরক্ষায় ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির বিকাশে জোর দিচ্ছে সরকার।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৪তম দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মাইলফলক: পিইডিপি-৫ চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির রূপরেখা তুলে ধরেন।
শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের পরিসংখ্যান: বর্তমানে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে চলমান ‘চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় ইতোমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষককে ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
আগামীর লক্ষ্য: আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া পঞ্চম কর্মসূচির মাধ্যমে বাকি শিক্ষকদেরও পর্যায়ক্রমে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ইংরেজির ভীতি দূর করতে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের এই ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সরকারের ইশতেহারেও শিক্ষাদানের মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
উপকূলের সুরক্ষা ও ‘সুনীল অর্থনীতি’তে নতুন রূপরেখা
সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম দক্ষিণাঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি, জলোচ্ছ্বাস এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বিবেচনা করে একটি পৃথক ‘উপকূল বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রস্তাব রাখেন।
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের ঘোষণা না দিলেও, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানান:
২০০৫ সালের নীতি ও বর্তমান ইশতেহার: প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার ‘উপকূলীয় অঞ্চল নীতি-২০০৫’ প্রণয়ন করেছিল, যা এই অঞ্চলের উন্নয়নে একটি মাইলফলক। এছাড়া বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও সমুদ্র সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবহার এবং একটি ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ (National Blue Economy Authority) প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
মেরিটাইম স্পেশাল প্ল্যানিং (MSP): সমুদ্র অঞ্চলের সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের জন্য সরকার ইতোমধ্যেই Maritime Spatial Planning বা সমুদ্র অঞ্চল পরিকল্পনা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন: সামুদ্রিক সম্পদ, মৎস্য, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি সমন্বিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।
প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এর উপকূলীয় এলাকা প্রতিনিয়ত সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের হুমকিতে থাকে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির কার্যকর বাস্তবায়ন কেবল উপকূলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিই আনবে না, বরং বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক সম্পদকে দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করবে।