দীর্ঘ দুই দশক ধরে সফল টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ যে বিধ্বংসী সংক্রামক রোগটিকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছিল, সেই ‘হাম’ আবার ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সরকারকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইতোমধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব কমাতে সরকার দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সকল শিশুর জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যার আওতায় প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এবারের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগের এবং বিস্ময়কর দিক হলো, নিয়ম অনুযায়ী হামের পূর্ণ দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুবরণও করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের এক সাম্প্রতিক জরিপে এই ভয়াবহ ও রহস্যময় চিত্র ফুটে উঠেছে। এই পরিস্থিতি টিকার কার্যকারিতা, তথ্য-উপাত্তের সঠিকতা এবং সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার গলদ নিয়ে নতুনভাবে গবেষণার জোরালো তাগিদ দিচ্ছে।
আমরা এতদিন জেনে এসেছি, হামের টিকা নিলে এই বিধ্বংসী রোগ থেকে নিশ্চিত সুরক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের জরিপ সেই বিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। হাম সন্দেহে ২ হাজার ৩১০ জন শিশুর ওপর চালানো জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদের মধ্যে ৫৪.৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকাই গ্রহণ করেনি, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং আমাদের টিকাদান কর্মসূচির আওতাবহির্ভূত বিশাল জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
তবে আরও বেশি ভীতিজাগানিয়া তথ্য হলো vaccinated বা টিকা নেওয়া শিশুদের নিয়ে। জরিপে দেখা গেছে, ২২ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ (এমআর-১) নেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২৩.২ শতাংশ শিশুকে হামের পূর্ণ দুই ডোজ (এমআর-১ ও ২) দেওয়ার পরও তাদের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, পূর্ণ সুরক্ষা বলয়ে থাকার কথা থাকলেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছে।
জরিপে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ৭৫১ জনের তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আরও সূক্ষ্ম চিত্র পাওয়া যায়। এখানে দেখা যায়, ৭১.৮ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি। এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি, যা প্রমাণ করে রোগটি অত্যন্ত ছোট শিশুদের আক্রমণ করছে। বাকি ১৭ শতাংশ শিশু এক ডোজ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি হলো, ১১.২ শতাংশ শিশু হামের পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করার পরও হামে আক্রান্ত হয়েছে। এই ১১.২ শতাংশ ব্যবধান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল ধাঁধা।
চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। জানুয়ারিতে ৫৫০ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৩০ জন শিশু প্রথম ডোজ এবং ১৩৮ জন শিশু দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ, টিকা নেওয়া সত্ত্বেও আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন ১১শ আক্রান্তের মধ্যে ৯৫ জন প্রথম ডোজ এবং ৯৯ জন দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছিল। বাকিদের অধিকাংশেরই টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই হাম হয়েছে। এই উপাত্ত স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, টিকা নেওয়া বা না নেওয়া—উভয় ধরনের শিশুই এখন ঝুঁকির মুখে।
বিগত চার বছরের তথ্যমতে, হামের টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়স (৯ মাস) হওয়ার আগেই শিশুদের আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এটি এবারের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম নতুন ও জটিল সংকট। ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ২০২৩ সালে ছিল ৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ১১ শতাংশ। কিন্তু এ বছর টিকা নেওয়ার আগেই ৩৩ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি তিনজন আক্রান্তের মধ্যে একজনেরই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। ৯ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হারও বিগত বছরের তুলনায় বেশি। বিগত তিন মাসে ১৮ শতাংশ শিশু আক্রান্ত হয়েছে, যাদের বয়স ৯ মাস থেকে এক বছর।
হামের এই পুনঃআবির্ভাব এবং টিকা নেওয়া শিশুদের আক্রান্ত হওয়া কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) বিশ্বব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি বিঘ্নিত হওয়া এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মিসড ভ্যাকসিনেশন (টিকা না পাওয়া) বিশাল এক ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি করেছে।
কিন্তু টিকা নিয়েও কেন আক্রান্ত হচ্ছে? বিজ্ঞানীরা এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. প্রাথমিক ভ্যাকসিনের ব্যর্থতা (Primary Vaccine Failure): প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজের পর পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি করতে পারে না। এজন্যই দ্বিতীয় ডোজ অত্যন্ত জরুরি, যা এই ব্যর্থতা কমিয়ে ১ শতাংশের নিচে নিয়ে আসে।
২. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া (Waning Immunity): টিকাদানের মাধ্যমে প্রাপ্ত ইমিউনিটি সময়ের সাথে সাথে কমে যেতে পারে। যদিও হামের টিকার ক্ষেত্রে এটি বিরল, তবে পুষ্টিহীনতা বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণে এমনটি হতে পারে।
৩. কোল্ড চেইন বজায় না থাকা (Cold Chain Breach): হামের টিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। উৎপাদন থেকে শুরু করে শিশুর শরীরে দেওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় (২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) না রাখলে টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে কোল্ড চেইন বজায় রাখা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
৪. পুষ্টিহীনতা ও ভিটামিন এ-এর অভাব: পুষ্টিহীন শিশুদের শরীর টিকার প্রতি সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না। ভিটামিন এ-এর অভাব হামের ঝুঁকি এবং তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোববার (১২ এপ্রিল) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মিল্টন হলে ‘হামের পুনঃআবির্ভাব: প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশের শীর্ষ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সেখানে তাদের উদ্বেগ এবং পরামর্শ তুলে ধরেন।
বৈঠকে বিএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক এক নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিন নিশ্চিত ছিলাম যে ৬ মাস পর্যন্ত শিশুদের হাম হয় না, কারণ মায়ের ইমিউনিটি (প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি) শিশুর শরীরে থাকে। কিন্তু এখন হচ্ছে। তার অর্থ, মায়ের ইমিউনিটি বাচ্চার শরীরে যাচ্ছে না। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।’ তিনি এর কারণ অনুসন্ধানে মায়েদের ওপর গবেষণা পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং কিশোরীদের বিয়ের আগে একটি বুস্টার ডোজ দেওয়া যায় কি না, তা ভেবে দেখার পরামর্শ দেন।
বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী আমাদের টিকাদান কর্মসূচির উপাত্তের সঠিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভুলটা কোথায় হয়েছে, সেটা আইডেন্টিফাই করতে হবে। আমাদের ভ্যাকসিন কাভারেজের তথ্যে বড় ধরনের গলদ আছে। কোনো কোনো জেলায় ১৫০% কাভারেজের কথা বলা হচ্ছে, যা অবাস্তব। এর মানে তথ্যগুলো সঠিক ছিল না।’ এই ভুয়া তথ্য আমাদের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে বাধা দিচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন্নেসা বলেন, ‘হাম একটি বিধ্বংসী রোগ, যা শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দেয়। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি এর অন্যতম কারণ। এটি তীব্র সংক্রামক। হাসপাতালে আলাদা কর্নার না থাকায় একটি শিশু আরও অনেকের মাঝে রোগ ছড়িয়ে দিচ্ছে।’ তিনি হাসপাতালে আইসোলেশন কর্নার এবং কোন কন্ডিশনে শিশু হাসপাতালে আসবে, সেটি নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবি জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত এক মাসে সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে ২৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে, হামের লক্ষণ নিয়ে বা সন্দেহজনক হিসেবে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৫১ জন শিশুর। অর্থাৎ, গত এক মাসে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৭৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা একটি জাতীয় বিপর্যয়। একই সময়ে সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ জন এবং সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২২৫ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে, এর পরেই অবস্থান রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের।
দেশব্যাপী হাম ছড়িয়ে পড়ায় সরকার দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। টিকা গ্রহণের বয়স ৯ মাসের স্থলে কমিয়ে ৬ মাসে নিয়ে আসা হয়েছে এবং গত ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। সংক্রমণের হার বিবেচনায় ১৮ জেলার ৩০ উপজেলার ১২ লাখ শিশুকে এই বিশেষ টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রোবাবার (১২ এপ্রিল) থেকে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে এই টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ১ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার শিশুর মাঝে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হবে। এর মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
টিকা নেওয়ার পরও ১১ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত হওয়া আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল বিপদের সংকেত। শুধুমাত্র টিকাদানের ওপর নির্ভর না করে, কেন টিকা কাজ করছে না, মায়ের ইমিউনিটি কেন শিশুর শরীরে যাচ্ছে না, কোল্ড চেইন বজায় থাকছে কি না, এবং আমাদের ডেটা কাভারেজ সঠিক কি না—এসব বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন জোরদার করা, হাসপাতালে আইসোলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। শিশুদের জীবন বাঁচাতে এই মুহূর্তে দরকার সমন্বিত, বৈজ্ঞানিক এবং তথ্যনির্ভর কার্যকর পদক্ষেপ।