২০০৭ সালের এক-এগারো (১/১১) রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গোয়েন্দা হেফাজতে রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য দিচ্ছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন, এক-এগারোর সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের কোনো ইচ্ছা সেনাবাহিনীর ছিল না; বরং এই চরম পদক্ষেপের নেপথ্যে মূল চাপটি এসেছিল দেশের প্রভাবশালী ‘দুই সম্পাদক’ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে।
সুশীল সমাজের চাপ ও ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পর্দার আড়ালের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন:
গ্রেপ্তার নয়, নির্বাসন: কোর কমান্ডের প্রাথমিক বৈঠকে জিয়া পরিবারকে কেবল গৃহবন্দি অথবা বিদেশে পাঠানোর (নির্বাসন) বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেনাবাহিনী তাদের গ্রেপ্তারের পক্ষে ছিল না।
দুই সম্পাদকের ভূমিকা: মাসুদ উদ্দিন জানান, ২০০৬ সালের অক্টোবরে গুলশানে প্রভাবশালী দুই সংবাদপত্রের মালিক এক শিল্পপতির বাসায় একটি নৈশভোজে অংশ নেন তিনি। সেখানে ওই দুই সম্পাদক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। তারাই মূলত বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে না সরালে (মাইনাস টু ফর্মুলা) দেশে কোনো কাঠামোগত রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়।
সেনাবাহিনীতে ক্ষোভের শঙ্কা: জেনারেল মাসুদ গোয়েন্দাদের জানান, তিনি সেই সময় সুশীল সমাজকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত। তার পরিবারকে গ্রেপ্তার করা হলে সাধারণ সেনাসদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। কিন্তু এরপরও ওই দুই সম্পাদক তাদের পত্রিকায় দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করে গ্রেপ্তারের পক্ষে জনমত তৈরি করেন।
সেনাপ্রধান হতে না পারার ক্ষোভ থেকে পটপরিবর্তন
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে, বিএনপির বিরুদ্ধে তার অবস্থানের মূল সূত্রপাত ২০০৫ সালে।
তৎকালীন বিএনপি সরকার জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী হয়েও পদবঞ্চিত হওয়ায় বিএনপির প্রতি তার তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
২০০৬ সালের শেষ দিকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে সেনাপ্রধান মইনের সঙ্গে তার দূরত্ব কমে আসে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ৮ জানুয়ারি সেনাপ্রধানের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকেই তারা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে হটিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেন।
কিংস পার্টি নিয়ে বিরোধ ও আ.লীগের সঙ্গে সমঝোতা
এক-এগারোর মাঝামাঝি সময়ে এসে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সঙ্গে মাসুদের মতবিরোধ দেখা দেয়। মইন তৎকালীন সামরিক শাসক এরশাদের মতো ক্ষমতা দখলের খায়েশ থেকে ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক দল বা ‘কিংস পার্টি’ গঠনের উদ্যোগ নেন, যার ঘোর বিরোধী ছিলেন মাসুদ।
রিমান্ডে মাসুদ আরও জানান, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন মূলত তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং আওয়ামী লীগের একটি ‘সমঝোতার’ ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সমঝোতার শর্ত অনুসারেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেনাপ্রধান হিসেবে মইন উ আহমেদকে বহাল রাখা হয়, ব্রিগেডিয়ার বারী ও আমিনকে নিরাপদে বিদেশে যেতে দেওয়া হয় এবং মাসুদ উদ্দিনকে অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।
জেনারেল মাসুদের বর্তমান আইনি পরিস্থিতি ও রিমান্ডের খতিয়ান
জাতীয় ও অন্যান্য গণমাধ্যমের তথ্যমতে, জাতীয় পার্টির সাবেক এই সংসদ সদস্য গত ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলায় ধারাবাহিকভাবে রিমান্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন:
অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচার: সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং মানবপাচারের অভিযোগে পল্টন মডেল থানার একটি মামলায় তাকে কয়েক দফায় ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যা মামলা: সবশেষ গত ১১ এপ্রিল জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার (২১ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু) মামলায় তাকে নতুন করে আরও চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নিজের দায় এড়াতে এক-এগারোর পুরো দায়ভার সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এবং সুশীল সমাজের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন কি না, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।