বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ন

২০৫০ সালের মধ্যে লিভারের রোগে ভুগবে বিশ্বের ১৮০ কোটি মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

বিশ্বজুড়ে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে এক নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে লিভারের রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ পূর্বাভাস—আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ ‘মেটাবলিক লিভার ডিজিজ’ বা লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদন এবং স্বনামধন্য চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি (Lancet Gastroenterology & Hepatology)-তে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজেস’ (GBD)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এই আশঙ্কাজনক তথ্য পাওয়া গেছে।

রোগের নাম ও বর্তমান চিত্র

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগটিকে বলা হয় ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’ বা এমএএসএলডি (MASLD)। পূর্বে এটি ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ (NAFLD) নামে পরিচিত ছিল। সাধারণত যারা মদ্যপান করেন না, তাদের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে।

  • বর্তমান অবস্থা: সর্বশেষ ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ (প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন বা ১৬ শতাংশ) এই রোগে ভুগছেন।

  • ভীতিকর বৃদ্ধি: মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে এই রোগে আক্রান্তের হার ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ সালে বিশ্বজুড়ে এই রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ কোটি।

  • ভবিষ্যতের শঙ্কা: গবেষকরা ধারণা করছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ রোগীর সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় আরও ৪২ শতাংশ বেড়ে ১৮০ কোটিতে পৌঁছাবে।

কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?

গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এমএএসএলডি-তে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি।

  • বয়সসীমা: সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় ৮০ থেকে ৮৪ বছর বয়সী বয়স্কদের মধ্যে। তবে সংখ্যার দিক থেকে তরুণ ও মধ্যবয়সীরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী পুরুষ এবং ৫৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

  • ভৌগোলিক অবস্থান: উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই রোগের প্রকোপ অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশি।

রোগের নেপথ্য কারণ ও উপসর্গ

ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন’ (IHME)-এর বিজ্ঞানীদের পরিচালিত এই গবেষণায় লিভারের এই রোগের পেছনে প্রধান তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

১. উচ্চ রক্তশর্করা (High Blood Sugar): টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিস এই রোগের সবচেয়ে বড় অনুঘটক।

২. স্থূলতা (High BMI): ওজন বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত চর্বি এই রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। ৩. ধূমপান: ধূমপানের কারণে শরীরে যে প্রদাহ (Inflammation) তৈরি হয়, তা লিভারের ক্ষতি ত্বরান্বিত করে।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এমএএসএলডি মূলত একটি ‘নীরব ঘাতক’। প্রাথমিক পর্যায়ে এর কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে রোগটি বাড়তে থাকলে অতিরিক্ত ক্লান্তি, শারীরিক দুর্বলতা এবং পেটের ডান দিকে (পাঁজরের নিচে) ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।

পরিণতি ও প্রতিরোধের উপায়

অত্যন্ত আশঙ্কার বিষয় হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি ধরা না পড়লে লিভারে প্রদাহ ও স্থায়ী ক্ষত (সিরোসিস) তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীতে লিভার ফেইলিউর বা লিভার ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রূপ নেয়। তবে গবেষকরা একটি ইতিবাচক দিকও জানিয়েছেন—আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে মৃত্যুহার কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।

এই নীরব ঘাতক থেকে বাঁচতে চিকিৎসকদের প্রধান পরামর্শ হলো জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন। শরীরের ওজন ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটা, চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং ধূমপান ত্যাগের মাধ্যমে লিভারের এই মারাত্মক ঝুঁকি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।


এ জাতীয় আরো খবর...