মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে, দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির মতো বেআইনি ও জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) বাংলাদেশ সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এসব কথা জানান।
জ্বালানি তেলের মূল্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের শঙ্কা
প্রেস ব্রিফিংয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার নিরিখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সরকারের সামনে আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি তেলের জন্য পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে এর সরাসরি চাপ পড়ে। সরবরাহ ও আমদানির ব্যয় স্বাভাবিক রাখতে সরকার তখন বাধ্য হয়েই অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম সমন্বয় বা বৃদ্ধি করে থাকে।
‘মব জাস্টিস’-এর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর বার্তা দেন তথ্য উপদেষ্টা। বিশেষ করে দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু গণপিটুনির ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব জাস্টিস বা গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলোকে ভীষণভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়ংকর ও বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মানুষ মনে করছে, চাইলেই যে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান সরকার এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এগোচ্ছে।”
‘শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র রাষ্ট্রের’
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো অবস্থাতেই গণপিটুনি মেনে নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, “অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই; এই অধিকার একমাত্র রাষ্ট্রের। কেউ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাকে পিটিয়ে মারা তো দূরের কথা, শারীরিকভাবে আঘাত করাও আইনসম্মত নয়।”
প্রশাসনিক তৎপরতা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ
অতীতে কিছু প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল স্বীকার করে ডা. জাহেদ বলেন, সরকার সেসব ত্রুটি দূর করতে দ্রুত কাজ করছে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের জঘন্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
পরিকল্পিত বা সংঘবদ্ধ সহিংসতাকে কঠোর হাতে দমন করা হবে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, “যে কোনো অভিযোগ বা অপরাধের ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়লে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা রাখতে হবে।”