বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: কাগজে নির্দলীয়, মাঠে কি দলেরই ছায়া?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

গ্রামের যে চায়ের দোকানে একসময় দলমত নির্বিশেষে এলাকার উন্নয়ন নিয়ে তুমুল আড্ডা বসত, গত এক দশকে সেই আড্ডায় বিভেদের দেয়াল তুলে দিয়েছিল দলীয় প্রতীক। স্থানীয় সরকারের মতো একেবারে তৃণমূলের একটি সেবামূলক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছিল রাজনৈতিক বিষবাষ্প। অবশেষে সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হলো। জাতীয় সংসদে একযোগে পাঁচটি বিল পাসের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।

কাগজে-কলমে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন—সবখানেই এখন প্রার্থীরা লড়বেন নির্দলীয় বা ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়ে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মনে একটি গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়েই গেছে—আইনের পাতা থেকে প্রতীক মুছে ফেললেই কি মাঠের রাজনীতি থেকে দলের ছায়া মুছে যাবে? নাকি প্রকাশ্যে প্রতীকের বদলে গোপনে চলবে ‘ছায়া নির্বাচন’ ও অদৃশ্য মনোনয়ন?


ফিরে দেখা: যেভাবে শুরু হয়েছিল তৃণমূলের দলীয়করণ

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো একটি উৎসবমুখর ও নির্দলীয় আবহে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। এলাকার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, স্কুলশিক্ষক বা সমাজসেবকরাই সাধারণত এসব পদে নির্বাচিত হতেন। কিন্তু এই দীর্ঘদিনের সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড়সড় আঘাত আসে ২০১৫ সালে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইন সংশোধনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের প্রথা চালু করে।

সেসময় সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা বাড়বে এবং স্থানীয় উন্নয়নের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের সমন্বয় সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে ফলাফল হয়েছিল ঠিক উল্টো এবং ভয়াবহ। দলীয় প্রতীক পাওয়ার জন্য দেশজুড়ে শুরু হয় কোটি কোটি টাকার ‘মনোনয়ন–বাণিজ্য’। তৃণমূলের জনপ্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে হাইব্রিড ও দুর্নীতিবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হয় দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’।

এর সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। প্রতীক পাওয়া প্রার্থী এবং দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। গ্রামের সামাজিক সম্প্রীতি চরমভাবে বিনষ্ট হয়, ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘাত শুরু হয়। এই বিষাক্ত পরিবেশ দেখে এলাকার সৎ, যোগ্য এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন।

আইনের সংস্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ এবং সংসদের মোহর

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে এই দলীয় আগ্রাসন থেকে মুক্ত করার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলো। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ নেয়। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের জোরালো সুপারিশের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে একটি অধ্যাদেশ জারি করে দলীয় প্রতীক বাতিল করে।

সেই ধারাবাহিকতায়, গণতান্ত্রিক ট্র্যাকে ফেরা বর্তমান নির্বাচিত সরকার বিষয়টিকে স্থায়ী আইনি রূপ দিতে উদ্যোগী হয়। গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল, ২০২৬) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে একযোগে পাস হয় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল—‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘পৌরসভা (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সিটি কর্পোরেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এগুলো পাকাপাকিভাবে আইনে পরিণত হবে। এর ফলে, জেলা পরিষদ বাদে বাকি চার স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে আর কোনো দলীয় মার্কা বা প্রার্থীর দলীয় পরিচয় ব্যালটে থাকছে না।


অদৃশ্য মনোনয়ন ও ‘ছায়া নির্বাচন’-এর শঙ্কা

আইনি এই পরিবর্তনকে সবাই সাধুবাদ জানালেও মাঠের বাস্তবতায় এটি কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর যে আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি বদলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, কেবল আইন পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকারে সুশাসন ফেরানো সম্ভব নয়। দীর্ঘ এক দশকের ‘দলীয়করণ সংস্কৃতি’ সমাজের যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তা সারিয়ে তোলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তার আশঙ্কার জায়গাটি হলো ‘অদৃশ্য মনোনয়ন’। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে যে আধিপত্য বিস্তারের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, তাতে হয়তো এখন কাগজে-কলমে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মনোনয়ন দেওয়া হবে না; কিন্তু বাস্তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থী বা ‘ছায়া মনোনয়ন’ ঠিকই মাঠে থাকবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য বা জেলার শীর্ষ নেতারা যদি কাউকে গোপনে সমর্থন দেন এবং প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তবে ফলাফল আগের মতোই হবে।”

যদি এমন ‘ছায়া নির্বাচন’ চলতে থাকে, তবে যে উদ্দেশ্যে আইনটি সংশোধন করা হলো—অর্থাৎ যোগ্য ও নির্দলীয় ব্যক্তিদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা—তা পুরোপুরি ব্যর্থ হবে। ভদ্রজনেরা আগের মতোই মাঠ থেকে দূরে থাকবেন।

বহুদলীয় বনাম নির্দলীয়: বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও আমাদের বাস্তবতা

বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রূপরেখা ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিবেশী ভারতে পঞ্চায়েত নির্বাচনে দলীয় প্রভাব থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে অনেক সিটি কর্পোরেশন ও লোকাল কাউন্সিল নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে (Non-partisan) অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কমিউনিটির প্রতি তার অবদানকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া। এখানে জাতীয় রাজনীতির চেয়ে এলাকার রাস্তাঘাট, বয়স্ক ভাতা, বিচার-শালিস বা জন্ম নিবন্ধনের মতো বিষয়গুলো বেশি জরুরি। কিন্তু যখনই এখানে দল ঢুকে পড়ে, তখন যোগ্যতার চেয়ে ‘দলের প্রতি আনুগত্য’ বেশি গুরুত্ব পায়। বদিউল আলম মজুমদার যেমনটি উল্লেখ করেছেন, “দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়ায় অনেক সময় যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রার্থীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে প্রার্থী কমে যায়। আর যখন প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ে, তখন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও বহুগুণ বেড়ে যায়।”

বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার পরীক্ষা

বর্তমানে রাজনৈতিক বিভক্তি বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে, এমনকি প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছে। এই ক্ষত নিরাময়ে নতুন আইনটি একটি দারুণ সুযোগ হতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়নের পুরো দায়ভার এখন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে তাদের স্থানীয় নেতাদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, যেন তারা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে প্রভাব না খাটায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাখার সদিচ্ছা দেখায় এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি ‘অনানুষ্ঠানিক সমর্থন’ দেওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারে, তবেই এই আইনি সংস্কার আলোর মুখ দেখবে।

কাগজে-কলমে দলীয় প্রতীকের বিদায় নিশ্চিত হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের সুফল পেতে হলে দলগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সত্যিকারের অর্থে ‘স্থানীয় মানুষের নির্বাচন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে, ব্যালট পেপার থেকে প্রতীক হয়তো হারাবে, কিন্তু পেশিশক্তি আর নেপথ্যের আধিপত্য হারাবে না। এখন দেখার বিষয়, আগামী নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জ কি তার পুরোনো সম্প্রীতির উৎসব ফিরে পায়, নাকি নতুন মোড়কে পুরোনো রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটে।


এ জাতীয় আরো খবর...