ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। সরকার গঠনের আমেজ কাটতে না কাটতেই এখন নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে শুরু হয়েছে অন্য এক লড়াই। এটি সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের লড়াই। তবে এই লড়াই এখন কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে রাজপথের ত্যাগী নেত্রী বনাম তারকা প্রার্থীদের এক মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক যুদ্ধে।
জাতীয় সংসদের মোট ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের বণ্টন হয় সাধারণ আসনে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে। এবারের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী:
বিএনপি: ৩৬টি আসন।
জামায়াতে ইসলামী: ১৩টি আসন।
এনসিপি: ১টি আসন।
বিএনপির ভাগের ৩৬টি আসনের জন্য গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়েছে। আর এই তিন দিনেই নয়াপল্টন কার্যালয় হয়ে উঠেছিল উৎসব আর উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৩৬টি আসনের বিপরীতে এবার রেকর্ড সংখ্যক ৯০০ জনের বেশি নারী নেত্রী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। প্রতিটি ফরমের মূল্য ছিল ২,০০০ টাকা এবং ফরম জমার সময় জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে ৫০,০০০ টাকা।
বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর এই ভিড় সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদকদের। তবে এই বিপুল অর্থ সংগ্রহের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা।
এবারের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ। তিনি ফরম সংগ্রহ করতে এলে নয়াপল্টনে উপস্থিত মাঠের নেত্রীদের তোপের মুখে পড়েন।
বগুড়া জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যারা বিগত ১৭ বছর রাজপথে পুলিশের লাঠি খেয়েছে, জেল খেটেছে, যাদের নামে ডজন ডজন মামলা—তাদের ফেলে রেখে কেন তারকাদের মূল্যায়ন করা হবে? ১৭ বছর কনকচাঁপা কোথায় ছিলেন?”
অন্যদিকে, কনকচাঁপা তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে ও সংবাদমাধ্যমে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বিএনপির রাজনীতি করার কারণে তিনি দীর্ঘ সময় পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁর ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়েছে। তিনি একে তাঁর ‘ত্যাগের স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখছেন।
বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর একটি বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “যাঁরা রাজপথে ঘাম ঝরিয়েছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাঁদের মূল্যায়নই হবে অগ্রাধিকার। সবাইকে রাজপথে নেমে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ দিতে হবে।”
রিজভীর এই কঠোর অবস্থান মাঠের কর্মীদের মধ্যে স্বস্তি আনলেও, তারকা প্রার্থী এবং প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের আত্মীয়দের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দল যদি কেবল তারকা বা অর্থশালীদের গুরুত্ব দেয়, তবে তৃণমূলের নারী সংগঠনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
মাঠের নেত্রী আর তারকাদের বাইরেও আরেকটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় রয়েছে। সেটি হলো নবনির্বাচিত এমপি এবং মন্ত্রীদের সহধর্মিণীদের বলয়। অনেক প্রভাবশালী নেতা চাইছেন তাঁর পরিবারের নারী সদস্যকে সংরক্ষিত আসনে বসাতে। এদের অনেকেই ইতিমধ্যে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়ার দাবি তুলে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। এটি দলের ত্যাগী নারী কর্মীদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি করেছে। তাঁদের মতে, এটি এক ধরনের ‘পরিবারতন্ত্র’ যা দলের আদর্শের পরিপন্থী।
৯০০ প্রার্থীর আমলনামা এখন দলের হাইকমান্ড তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টেবলে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার মনোনয়নের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে:
বিগত ১৭ বছরের সক্রিয়তা: যারা রাজপথে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন।
পেশাগত যোগ্যতা: সংসদে যারা গঠনমূলক বিতর্ক করতে পারবেন।
এলাকায় জনপ্রিয়তা: যাদের মনোনয়ন দিলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নারী ভোটারদের মাঝে দলের ভিত্তি শক্ত হবে।
সংরক্ষিত আসনের এই লড়াই এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে চলছে পাল্টা-পাল্টি পোস্ট ও ভিডিও শেয়ার। মাঠের কর্মীরা যেমন তাদের ত্যাগের ছবি শেয়ার করছেন, তেমনি তারকা প্রার্থীরাও তাদের অবদানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে বিএনপির ৩৬টি আসনের এই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা এখন চূড়ান্ত উত্তেজনায়। মাঠের নেত্রীদের আবেগ নাকি তারকাদের গ্ল্যামার—কার ভাগ্যে জুটবে সংসদের টিকিট, তা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের একটাই দাবি— “যাঁরা দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, সুসময়ে যেন তাঁরাই পুরস্কৃত হন।”