বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ন

কুষ্টিয়ায় পীর খুনের নেপথ্যে ভয়ংকর ব্লু-প্রিন্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৭ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

আধুনিক বাংলাদেশে একটি মানুষের জীবন কেড়ে নিতে এখন আর কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না কোনো ভাড়াটে খুনিরও। স্রেফ একটি ৭ সেকেন্ডের কাটাছেঁড়া ভিডিও, কয়েকটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আর ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ ধুয়া তুলে উসকে দেওয়া একদল উন্মত্ত জনতা—এই তিনটি উপাদানেই অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সম্পন্ন হচ্ছে ঠান্ডা মাথার খুন। কুষ্টিয়ায় পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে হত্যার ঘটনাটি সাধারণ কোনো ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি নয়, বরং এটি ছিল ‘তৌহিদী জনতা’র মুখোশ পরা একদল ঘাতকের পূর্বপরিকল্পিত নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট।

কিন্তু কে বা কারা এই ঘাতক? কেন রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ক্ষেত্রে নীরব দর্শক? এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের গভীরে ডুব দিলে বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর অন্ধকার জগতের চিত্র।

হত্যার ছক: ৭ সেকেন্ডের ভিডিও এবং ৭টি ভুয়া আইডি

কুষ্টিয়ার পীর শামীম রেজাকে হত্যার দিন সকালে যা ঘটেছিল, তা যেকোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। স্থানীয় ও অনুসন্ধানী সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, হামলার ঠিক আগে সকালে ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তির একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য একটাই—পীরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সরাসরি খুন করলে খুনের মামলা হবে, তাই তারা বেছে নেয় ‘মব’ বা উন্মত্ত জনতার ঢাল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, একই দিনে, ঠিক একই সময়ে ৭টি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পীর শামীম রেজার অনেক বছর আগের একটি ৭ সেকেন্ডের খণ্ডিত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওটির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সম্পাদনা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, একটু খেয়াল করলেই সত্য ধরা পড়ে। বর্তমান পীর শামীমের চুল ও দাড়ি সম্পূর্ণ সাদা, অথচ ভাইরাল হওয়া ওই পুরোনো ভিডিওতে তার চুল-দাড়ি কুচকুচে কালো! কোনো একটি ধর্মীয় তাত্ত্বিক আলোচনার মাঝখান থেকে মাত্র ৭ সেকেন্ড কেটে নিয়ে শব্দ ও বাক্য বিকৃত করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে সহজেই সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এরপর সেই ৪০-৫০ জন পরিকল্পনাকারী নিজেরাই সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে পীরের দরবারে হামলা চালায় এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় ‘তৌহিদী জনতা’র ঘাড়ে।

‘তৌহিদী জনতা’র আড়ালে কারা? কী বলছে পরিসংখ্যান?

সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত (ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে) সারা দেশে অন্তত ৯৭টি মাজার, দরবার শরীফ ও খানকায় ভয়াবহ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩ জন নিরীহ মানুষ।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সেই দেড় বছরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হলেও, মাজার বা সুফি সাধকদের ওপর হামলার ঘটনায় দৃশ্যত কোনো মামলাই হয়নি! কেন? কারণ, প্রতিটি ঘটনার পরই ঘাতকরা ‘তৌহিদী জনতা’ নাম ধারণ করে জনতার ভিড়ে মিশে গেছে। এর আগে বাউল আবুল সরকারের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে একটি যুক্তিতর্কের মাঝখানের খণ্ডিত লাইন প্রচার করে তার অনুসারীদের ওপর নারকীয় হামলা চালানো হয়েছিল।

মব জাস্টিসের লাইসেন্স: রাষ্ট্র কেন নীরব দর্শক?

একটি স্বাধীন দেশে কোনো ব্যক্তি যত বড় অপরাধীই হোন না কেন, ৪০-৫০ জন মানুষকে তাকে হত্যা করার লাইসেন্স কে দিল? এই প্রশ্নটি এখন দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, বিশেষ করে পুলিশের মনোবল চরমভাবে ভেঙে পড়েছে। সেসময় অনেক পুলিশ সদস্য জনতার রোষানলের শিকার হলেও তার কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। ফলশ্রুতিতে, পুলিশ এখন যেকোনো ‘মব’ বা উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রীতিমতো ভয় পায়। তারা এখন প্রতিরোধ করার চেয়ে ‘নিরাপদ দূরত্বে’ নীরব দর্শক হয়ে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ‘মব’ বা গণজমায়েত একটি নিয়মিত ও বৈধ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই আমরা দেখেছি, মব করে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাসসের প্রধান সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর গত সপ্তাহে চাঁদপুরে সোলায়মান পাগলার মাজারের মেলায় যে বর্বরোচিত হামলা হলো, তা প্রমাণ করে যে মাজার ও সুফিদের ওপর মব জাস্টিস এখন দেশের একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

পালাবদলের পরও বিচারহীনতার সংস্কৃতি!

২০২৬ সালের শুরুতে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার গঠন করলেও, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের বর্তমান প্রশাসনেও মবের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর বা কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। কুষ্টিয়ায় পীর শামীম রেজার মতো এমন একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পরও অপরাধীদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রের কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

বিএনপি বারবার আইনের শাসনের কথা বললেও, বাস্তবতা হলো—বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যেন এখন বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে পরিণত হতে চলেছে।

কুষ্টিয়ার পীর শামীম রেজা হয়তো শেষ শিকার নন। যতক্ষণ পর্যন্ত ৭ সেকেন্ডের ভুয়া ভিডিও তৈরি করে ‘তৌহিদী জনতা’র আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওই ৪০-৫০ জন ঘাতককে আইনের আওতায় না আনা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের কোনো নাগরিকই নিরাপদ নন। মব জাস্টিস কোনো বিচার নয়, এটি স্রেফ পরিকল্পিত খুন। রাষ্ট্র যদি এখনই এই খুনিদের লাগাম টেনে না ধরে, তবে এই মবের আগুন একদিন পুরো সমাজের বিচারব্যবস্থাকেই পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। সাধারণ মানুষের এখন একটাই জিজ্ঞাসা—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ভয়ংকর লাইসেন্স আর কতদিন চলবে?


এ জাতীয় আরো খবর...