বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ন

দুই ডোজ নেওয়ার পরও হামের বাড়তি টিকা কেন জরুরি? জেনে নিন বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১১ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশে শিশুদের সুরক্ষায় দেশব্যাপী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবকের মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগছে—যেসব শিশু ইতোমধ্যেই এই টিকার দুটি ডোজ নিয়ে ফেলেছে, তাদের কেন আবারও নতুন করে টিকা দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তরটি মূলত হামের তীব্র সংক্রামক প্রকৃতি এবং ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণার ওপর নির্ভরশীল। হাম পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর সংক্রামক একটি রোগ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বেসিক রিপ্রোডাকশন নাম্বার বলা হয়। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ২ থেকে ৪.৬। এমনকি হামের জীবাণু বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

এই তীব্র সংক্রমণ ক্ষমতার কারণেই হামকে রুখে দিতে সমাজের অন্তত ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষের শরীরে কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি থাকা অপরিহার্য। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা কোভিড-১৯ এর মতো রোগের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি কিছুটা কম হলেও চলে, কিন্তু হামের ক্ষেত্রে তা সর্বোচ্চ মাত্রায় থাকা প্রয়োজন। যদিও হামের টিকার দুটি ডোজ একজন শিশুকে প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়, তবুও কিছু শিশুর শরীরে শতভাগ অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে এই সামান্য সুরক্ষার ঘাটতিও যেকোনো সময় বড় আকারের স্বাস্থ্যঝুঁকি বা প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে।

অনেকেই ভাবতে পারেন, যারা আগে টিকা নেয়নি কেবল তাদের দিলেই তো সমাজের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু টিকা নেওয়ার সংখ্যার ওপর হার্ড ইমিউনিটি নির্ভর করে না; বরং কতজনের শরীরে সত্যিকার অর্থে কার্যকর ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেটিই আসল বিষয়। আগের ডোজগুলো নেওয়ার পরও যেসব শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত ইমিউনিটি তৈরি হয়নি, এই অতিরিক্ত ডোজটি তাদের সেই ঘাটতি পূরণ করে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, যাদের ইমিউনিটি তৈরি হয়নি শুধু তাদেরকেই কেন খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া হচ্ছে না? এর কারণ হলো, সাধারণ কোনো ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে লাখ লাখ শিশুর ইমিউনিটি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা কার্যত অসম্ভব। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে সংক্রমণের চেইন দ্রুত ভেঙে ফেলতে এবং সবাইকে সমান সুরক্ষার আওতায় আনতে একত্রে গণটিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়।

বাড়তি এই ডোজটি শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও অত্যন্ত উপকারী। এটি কোনো নতুন বা পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নয়। এর আগে ২০২০ সালেও দেশে একইভাবে প্রায় ৩ কোটি শিশুকে হামের অতিরিক্ত টিকা দেওয়া হয়েছিল এবং এতে কোনো শিশুরই বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। বাংলাদেশে ১৯৮৯ সাল থেকে হামের এবং ২০১২ সাল থেকে হাম-রুবেলার টিকা অত্যন্ত সফল ও নিরাপদভাবে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস-এর মতো আন্তর্জাতিক ও বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোও হাম সম্পূর্ণ নির্মূল করতে এবং প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এই ধরনের অতিরিক্ত ডোজ প্রদানকে অত্যন্ত কার্যকর, নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...