বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন

এক বছরের বেশি বন্ধ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সোয়া ২ কোটি শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৭ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

দেশে শিশুদের অন্ধত্ব দূরীকরণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ‘ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বছরে দুবার এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও, গত দুই বছরে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র দুবার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সোয়া দুই কোটি শিশুকে লক্ষ্য করে পরিচালিত এই জাতীয় কর্মসূচিটি মূলত প্রশাসনিক জটিলতা, বাজেট বরাদ্দ এবং ক্যাপসুল কেনার দীর্ঘসূত্রতার কারণেই থমকে আছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিপূরক পুষ্টি না পাওয়ার কারণে দেশের লাখ লাখ শিশু এখন হাম ও ডায়রিয়ার মতো সংক্রামক রোগের পাশাপাশি মারাত্মক পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছে।

ভিটামিন ‘এ’ এমন একটি উপাদান যা মানবদেহ নিজে তৈরি করতে পারে না। খাদ্যের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়ায় শিশুদের প্রতি ছয় মাস পরপর পরিপূরক হিসেবে এই ক্যাপসুল খাওয়ানো জরুরি। কারণ, শরীরে এই ভিটামিন মাত্র চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সঞ্চিত থাকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্যাম্পেইন ব্যাহত হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ক্ষতি চোখে না পড়লেও, শিশুদের শরীরে নীরবে পুষ্টিহীনতা বাসা বাঁধছে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশে হামের মতো সংক্রামক রোগের যে প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, তাকে ভিটামিন এ-এর অভাবেরই একটি সম্ভাব্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া ২০০৩ সাল থেকে ভিটামিন এ ক্যাপসুলের সঙ্গে কৃমিনাশক ট্যাবলেটও খাওয়ানো হতো, কারণ শরীরে কৃমি থাকলে ভিটামিন এ-এর শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু গত দুই বছর ধরে নিয়মিত কৃমিনাশক সপ্তাহও পালিত হয়নি।

এই সফল কর্মসূচিটি হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ার মূল কারণ লুকিয়ে আছে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য খাতের অধিকাংশ কার্যক্রম পাঁচ বছর মেয়াদি ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ (ওপি)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু সর্বশেষ ওপি বা চতুর্থ স্বাস্থ্য কর্মসূচির মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে পঞ্চম কর্মসূচির অনুমোদন মেলেনি। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে সিদ্ধান্ত হয় যে, খাতভিত্তিক এই কর্মসূচিগুলো এখন থেকে সরাসরি সরকারের রাজস্ব খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে বাজেট বরাদ্দ ও প্রকল্প অনুমোদনে ব্যাপক জটিলতা দেখা দেয়, যার কারণে ক্যাপসুল কেনা বা মাঠপর্যায়ে বিতরণের পুরো ব্যবস্থাটিই অচল হয়ে পড়ে। জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে যে ক্যাম্পেইনটি হয়েছিল, সেটি মূলত আগের কেনা পুরোনো মজুত দিয়েই কোনোমতে সম্পন্ন করা হয়।

নতুন করে ক্যাপসুল কিনে ক্যাম্পেইন শুরু করার বিষয়েও দেখা দিয়েছে আরেক বিপত্তি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী জানান, রাজস্ব খাতের বাজেটে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে এই ক্যাপসুল কেনার কথা। কিন্তু দরদাতারা অস্বাভাবিক বেশি দাম হাঁকায় এরই মধ্যে দুবার দরপত্র বাতিল করতে হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয় দরপত্রের কাজ শেষ করে তা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় পুষ্টি সেবার সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা সুলতানার মতে, সেক্টর কর্মসূচি বাতিল হওয়ার কারণে জাতীয় পুষ্টি সেবা (এনএনএস) বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিচালন ব্যবস্থাই এখন একটি শূন্যতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ফলে ঔষধাগার থেকে কবে নাগাদ ক্যাপসুল সরবরাহ করা হবে এবং কবে আবার দেশের সোয়া দুই কোটি শিশু এই জরুরি স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...