বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ন

খেলাপিদের মালিকানায় কি ফের ৫ ব্যাংক?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

রাতের অন্ধকারে ডাকাতি হলে, ডাকাত পালানোর পর অন্তত শূন্য ঘরটা টিকে থাকে। কিন্তু দিনের আলোতে, আইনের নাকের ডগা দিয়ে, খোদ পাহারাদার যখন আস্ত একটা ব্যাংক গিলে খায়, তখন পড়ে থাকে শুধুই অর্থনীতির কঙ্কাল। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে এমন সর্বগ্রাসী লুটপাটের সবচেয়ে বড় এবং করুণ শিকার দেশের পাঁচটি পরিচিত ইসলামী ব্যাংক। কোটি কোটি সাধারণ মানুষের রক্ত ঘামে অর্জিত জমানো টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা এই ব্যাংকগুলোকে যারা একেবারে নিঃস্ব করেছে, সেই এস আলম বা নাসা গ্রুপের মতো শীর্ষ ঋণখেলাপিদের হাতেই কি আবারও ফিরছে ব্যাংকের চাবি?

সম্প্রতি দেশের আর্থিক অঙ্গনে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এমন এক আতঙ্কের গুঞ্জন। সাধারণ আমানতকারীদের মনে একটিই বিস্ফোরক প্রশ্ন—যে রক্ষক ভক্ষক হয়ে পুরো খাতকে খাদের কিনারে ঠেলে দিল, তাকেই কি ফের পাহারায় বসানো হচ্ছে? যদি তাই হয়, তবে পরিবর্তনের অর্থ কী?

গুঞ্জনের কেন্দ্রবিন্দু: মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশের ফাঁদ

গুঞ্জনটি নিছক কোনো হাওয়া থেকে পাওয়া কথা নয়, এর পেছনে রয়েছে একটি সূক্ষ্ম গাণিতিক হিসাব, যা শুনে যে কারো চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি বড়সড় ‘সার্জারি’র সিদ্ধান্ত নেয়। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি চরম রুগ্ণ ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন মেগা ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, নবগঠিত এই ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর প্রস্তাবিত পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক জোগান দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি থাকছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। ভয়ংকর অভিযোগটি হলো, এই বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ (প্রায় ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা) জমা দিয়েই পুরোনো মালিকরা, অর্থাৎ যারা ব্যাংক লুট করেছে, তারা আবারও পুরো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পকেটে পুরতে চাইছে! জনগণের করের টাকায় ব্যাংক উদ্ধার হবে, আর নামমাত্র মূলধন দিয়ে লুটেরারা ফের মালিকের চেয়ারে বসবে—এমন খবরে স্বভাবতই তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

ফ্ল্যাশব্যাক: যেভাবে কঙ্কাল হলো ৫টি ব্যাংক

এই গুঞ্জনের ভয়াবহতা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দেশের ব্যাংকিং খাতকে রীতিমতো নিজেদের জমিদারি বানিয়ে ফেলেছিল এস আলম গ্রুপ এবং তাদের দোসররা। ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের যে ধর্মীয় আবেগ ও অগাধ আস্থা রয়েছে, তাকেই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে তারা।

নামে-বেনামে ভুতুড়ে কোম্পানি খুলে, কোনো ধরনের বৈধ বন্ধকি ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বের করে নেওয়া হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একসময় অত্যন্ত লাভজনক হলেও, আগ্রাসী অধিগ্রহণের পর এগুলো তারল্য সংকটে ধুঁকতে শুরু করে। ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের জন্মই হয়েছিল লুটপাটের নীলকশা বাস্তবায়নের জন্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতেই, শুধুমাত্র এস আলম গ্রুপ একাই এই ব্যাংকগুলো থেকে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি বের করে পাচার করেছে সিঙ্গাপুর, দুবাই, সাইপ্রাসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

ব্যাংকগুলোর ভল্ট যখন ফাঁকা, জীবনভর জমানো পেনশনের টাকা বা চিকিৎসার জন্য রাখা মাত্র ১০ হাজার টাকা তুলতে গিয়েও সাধারণ গ্রাহকরা যখন দিনের পর দিন ব্যাংকের দরজায় কেঁদে ফিরেছেন, ঠিক তখনই ঘটে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন।

খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে সত্যের অনুসন্ধান: আসলেই কি ফিরছে তারা?

দেশজুড়ে যখন এই সাড়ে ৭ শতাংশ মূলধন দিয়ে মালিকানা ফিরে পাওয়ার খবরে তোলপাড়, তখন পর্দার আড়ালের আসল চিত্রটি কী? দেশি ও বিদেশি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বস্তিদায়ক একটি চিত্র চোখে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে যে, পুরোনো লুটেরাদের হাতে কোনোভাবেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ রাখা যাবে না। তাই এই গুঞ্জনকে বাস্তব রূপ না দিতে বেশ কিছু কঠোর আইনি পদক্ষেপ এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে:

  • মালিকানা স্বত্ব বাতিল: ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স’-এর মতো কঠোর আইনের প্রয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এই পাঁচটি ব্যাংকে এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমস্ত শেয়ার বাজেয়াপ্ত বা ‘শূন্য’ (Zero) ঘোষণা করেছে। ব্যাংকগুলোর নিট সম্পদমূল্য বিপুলভাবে ঋণাত্মক (Negative) হওয়ায় আইনিভাবেই তাদের আর মালিকানা দাবি করার কোনো অধিকার নেই।

  • রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রূপান্তর: একীভূত হওয়া ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মতো পুরোনো মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। বরং একে দেশের প্রথম রাষ্ট্রায়ত্ত শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।

  • কঠোর পর্ষদ ও নজরদারি: সরকার এরই মধ্যে সৎ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যাংকারদের সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দিয়েছে। এই পর্ষদের একমাত্র লক্ষ্য হলো লুণ্ঠিত অর্থ দেশি-বিদেশি আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা এবং গ্রাহকদের আমানতের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

নেপথ্যের লড়াই: আর্থিক মাফিয়ারা কি তবে হাল ছেড়েছে?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার খেলাপিদের মালিকানা চিরতরে বাতিল করলেও, এই আর্থিক মাফিয়ারা সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। তারা দেশ ও দেশের বাইরে আত্মগোপনে থেকেও এখনো আইনি ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের বেনামি এজেন্টদের মাধ্যমে নতুন ব্যাংকের শেয়ার কিনে পেছনের দরজা দিয়ে আবারও বোর্ডে ঢোকার যে নীলকশা তারা এঁকেছিল, সেই অপচেষ্টারই অংশ হলো এই ‘সাড়ে ৭ শতাংশের গুঞ্জন’। তারা চেয়েছিল বাজারে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আমানতকারীদের মাঝে প্যানিক সৃষ্টি করতে এবং সরকারকে চাপে ফেলতে।

তবে ড. ইউনূসের সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। ব্যাংক খাত সংস্কার কমিশনের কড়া নজরদারির কারণে লুটেরাদের সেই স্বপ্ন আপাতত দুঃস্বপ্নেই পরিণত হয়েছে। হাজার কোটি টাকা লুট করে মাত্র সাড়ে সাত শতাংশের টোপ দিয়ে ফের ব্যাংকের মালিক হওয়ার যে দুঃসাহসী দিবাস্বপ্ন তারা দেখেছিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর হস্তক্ষেপে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

 লুটপাটের ক্ষত এতটাই গভীর যে, তা নিরাময় হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সাধারণ আমানতকারীদের টাকা কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক নিয়মে তোলা যাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবে একটি বিষয় এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট—যারা ব্যাংকগুলোকে আইসিইউতে পাঠিয়েছে, তাদের হাতে আর কোনোভাবেই লাইফ সাপোর্টের সুইচ তুলে দেওয়া হচ্ছে না। আর্থিক খাতের এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে—মাফিয়ারা নাকি সাধারণ মানুষ, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, খেলাপিদের ফের মালিকানায় ফেরার পথটি নিশ্ছিদ্রভাবেই সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...