মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, নিরাপত্তার অভাব এবং উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের (জেট ফুয়েল) অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশপথে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়ার মতো বড় এয়ারলাইনগুলো ঢাকা, নেপাল ও থাইল্যান্ড রুটে তাদের ফ্লাইটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনেছে। এর ফলে টিকিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
ফ্লাইট কমার পেছনের মূল তিন কারণ
টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কেএম মোজিবুল হকের মতে, এই সংকটের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে:
নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থাহীনতা: মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের একটি বড় ট্রানজিট হাব। কিন্তু যুদ্ধ এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলার কারণে যাত্রীরা এই রুটটি এড়িয়ে চলছেন।
আকাশসীমা ব্লক: স্থায়ী যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত উপসাগরীয় (গালফ) দেশগুলো বিদেশী ক্যারিয়ারের জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ রাখছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: ঢাকা থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার ৬০-৭০ শতাংশ যাত্রীই মধ্যপ্রাচ্যগামী। গন্তব্য বন্ধ থাকা এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় তারা ফ্লাইট কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
জেট ফুয়েলের দামে নজিরবিহীন উল্লম্ফন
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে দেশে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম ১৮২ শতাংশ বেড়েছে।
গত ২৪ মার্চ প্রথম দফায় প্রতি লিটারে দাম বাড়ে প্রায় ৯০ টাকা এবং ৭ এপ্রিল বাড়ে আরও ২৪ টাকা ৭৯ পয়সা।
বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২২৭ টাকা ৮ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে তা ১.৪৮০৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইউরোপেও জেট ফুয়েলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের ৮৩১ ডলার থেকে লাফিয়ে প্রতি টন ১ হাজার ৮৩৮ ডলারে পৌঁছেছে।
বাতিল হাজারো ফ্লাইট, টিকিটের দামে আগুন
জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে টিকিটের ওপর। এরই মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের দাম গড়ে প্রায় ১ হাজার এবং আন্তর্জাতিক রুটে ৫ হাজার টাকার বেশি বেড়েছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশ আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় গত দেড় মাসে ঢাকা থেকে মোট ১ হাজার ৬০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। যাত্রীদের এখন বিকল্প হিসেবে মুম্বাই বা দিল্লির মতো হাব হয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
হুমকিতে পর্যটন ও এভিয়েশন খাত
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশি জানান, ফ্লাইট কমা এবং ভাড়া বাড়ার কারণে মানুষের ভ্রমণ বা অবকাশযাপনের চাহিদা তলানিতে নেমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের পর্যটন ও এভিয়েশন খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হবে। বিশ্লেষকরা আগামী দিনগুলোতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না, বরং উচ্চ ভাড়া ও ফ্লাইট শিডিউলে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন।