যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য যখন ধীরে ধীরে একটি গতির সঞ্চার হচ্ছে, ঠিক তখনই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর তা হলো— বিদেশের মাটিতে আটকে থাকা বা জব্দ করা ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে নতুন করে দাঁড় করাতে ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের এই জব্দকৃত সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বারা আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি বছরের পর বছর ধরে ধুঁকছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে আমেরিকানদের জিম্মি করার ঘটনার মধ্য দিয়ে এই নিষেধাজ্ঞার সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জেরে এই নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা হয়। এসব কঠোর পদক্ষেপের কারণে তেহরান বিদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত তাদের নিজস্ব সম্পদ, বিশেষ করে তেল বিক্রির বিপুল আয়ের নাগাল পেতে ব্যর্থ হচ্ছে।
গত ১০ এপ্রিল, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা শুরু হওয়ার আগে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) স্পষ্টভাবে জানান যে, যেকোনো ধরনের আলোচনা শুরুর আগে বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের রাজস্ব বা সম্পদ অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে।
ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়ার পরের দিন কিছু গণমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, দেশের বাইরে আটকে থাকা ইরানের অন্তত কিছু সম্পদ ছাড় দিতে ওয়াশিংটন সম্মত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন সরকার দ্রুত এই প্রতিবেদনগুলো নাকচ করে দিয়ে জোর দিয়ে জানায় যে, ওই সম্পদগুলো আগের মতোই জব্দ অবস্থাতেই রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল ভোরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই আগামী দিনগুলোতে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা। ফলে এই সম্পদ জব্দের বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা আবারও সামনে আসবে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— ঠিক কী পরিমাণ সম্পদ জব্দ রয়েছে, কেন তেহরান এই অর্থের নাগাল পাচ্ছে না, বর্তমানে এই তহবিলগুলো কোথায় আছে এবং এই অর্থ ইরানের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ইরানের ঠিক কী পরিমাণ সম্পদ বিদেশে জব্দ রয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা একক হিসাব নেই। তবে ইরানের সরকারি প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদের মোট পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলারেরও বেশি।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার এ প্রসঙ্গে আল জাজিরাকে জানান, এই সম্পদের পরিমাণ ইরান প্রতি বছর হাইড্রোকার্বন বা জ্বালানি তেল বিক্রি করে যে আয় করে, তার প্রায় চার গুণের সমান। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত বিশাল একটি অংক, বিশেষ করে এমন একটি সমাজের জন্য যারা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার অধীনে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।”
তবে তিনি একটি সংশয়ও প্রকাশ করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত এই সম্পদ ছেড়ে দিতে রাজিও হয়, তবু তারা এই অর্থ ব্যবহারের ওপর কোনো শর্ত জুড়ে দেবে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। স্নাইডার আরও বলেন, “ইরানের এই সম্পদের চরম প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার বিশৃঙ্খল ইতিহাস এবং মার্কিন পক্ষে খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করার মতো বিশেষজ্ঞের অভাব থাকায় ইরান পুরো বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান।”
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জ্যাকব লিউ ২০১৬ সালে জানিয়েছিলেন, সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও ইরান বিদেশে আটকে থাকা তাদের সব সম্পদের নাগাল পাবে না। সেই সময় পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পরাশক্তির সঙ্গে ইরান একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছেছিল। লিউ তখন মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন যে, বাস্তবে ইরান বড়জোর তাদের জব্দ করা সম্পদের অর্ধেকটা হাতে পাবে, কারণ বাকি অর্থ এরই মধ্যে পূর্বপ্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বা ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে।
বর্তমানে, যুদ্ধবিরতি আলোচনায় তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো— পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ (Confidence-building measure) হিসেবে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া হোক।
যখন কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল, সম্পত্তি বা সিকিউরিটিজ অন্য কোনো দেশের কর্তৃপক্ষ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা সাময়িকভাবে আটকে রাখা হয়, তখন তাকে সম্পদ জব্দ বা ‘ফ্রিজিং অব অ্যাসেটস’ বলা হয়। এর ফলে নিষেধাজ্ঞা, আদালতের নির্দেশ বা অন্যান্য আইনি কারণে সম্পদের মালিকানা থাকা সত্ত্বেও তা বিক্রি বা ব্যবহার করার ক্ষমতা হারায় সংশ্লিষ্ট পক্ষ।
সাধারণত, অপরাধমূলক কার্যকলাপ, অর্থ পাচার বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অন্য কোনো দেশ বা কোম্পানির সম্পদ জব্দ করে থাকে।
তবে সমালোচকরা মনে করেন, এই ব্যবস্থার প্রয়োগ অত্যন্ত বৈষম্যমূলক এবং এটি মূলত পশ্চিমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের লক্ষ্য করেই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অবৈধ যুদ্ধ পরিচালনা এবং বর্ণবাদের মতো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের বিদেশি সম্পদ আজ পর্যন্ত কোনো দেশ জব্দ করেনি।
বিপরীতে, ইরান, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া, ভেনিজুয়েলা এবং কিউবার মতো দেশগুলোর সম্পদ বিদেশি সরকারগুলো বারবার জব্দ করেছে। এই দেশগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ মিল হলো— তারা সবাই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরোধিতা করেছে বা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি আর্কাইভ অনুযায়ী, ইরানের ওপর প্রথম সম্পদ জব্দের ঘটনা ঘটে ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঘোষণা করেছিলেন যে, ইরান “যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনীতির জন্য একটি অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি” হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই সময়ে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন আমেরিকান নাগরিককে জিম্মি করে রেখেছিল ইরানি শিক্ষার্থীরা।
তৎকালীন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম মিলার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সে সময় ইরানের তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের কম। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি ছিল নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ট্রেজারি নোট। ১৯৮১ সালে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘আলজিয়ার্স চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে তেহরানে আটকে থাকা ৫২ জন আমেরিকান বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সম্পদের একটি বড় অংশ অবমুক্ত করে।
তবে পরবর্তী বছরগুলোতে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হতে থাকে। ইরান সবসময় দাবি করে এসেছে যে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুধুমাত্র বেসামরিক শক্তির প্রয়োজনে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র বারবার অভিযোগ করেছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্যই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা (বিশেষ করে ইউরোপ) ইরানের ওপর দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। (উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র ইসরায়েলের কাছেই গোপন কর্মসূচির মাধ্যমে তৈরি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হলেও, তারা কখনো এ ধরনের কোনো তদন্ত বা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েনি)।
চুক্তি এবং পুনরায় নিষেধাজ্ঞা:
২০১৫ সাল: বারাক ওবামার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরান ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA)’ নামের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পারমাণবিক কর্মসূচি কমিয়ে আনার শর্তে ইরান বিদেশে থাকা তাদের বেশিরভাগ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।
২০১৮ সাল: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। চুক্তিটিকে ‘একপেশে’ আখ্যা দিয়ে তিনি ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যার ফলে তাদের বিদেশি সম্পদ আবারও জব্দ হয়।
২০২৩ সাল: যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি বন্দী বিনিময় চুক্তি হয়। এর আওতায় ইরান পাঁচজন মার্কিন-ইরানি নাগরিককে মুক্তি দেয় এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকজন ইরানি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলারের তেলের আয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, অর্থ তদারকির জন্য তা কাতারে স্থানান্তর করা হয়।
২০২৪ সাল: ইসরায়েলের ওপর ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর ফলে দোহায় রাখা ওই সম্পদের ওপরও ইরান পুনরায় নিয়ন্ত্রণ হারায়।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) মানবাধিকার লঙ্ঘন, পারমাণবিক চুক্তির শর্ত ভঙ্গ, সন্ত্রাসবাদে মদদ এবং রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন সরবরাহ করার অভিযোগে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ আংশিকভাবে জব্দ করেছে।
ইরানের জব্দ করা বিপুল পরিমাণ এই সম্পদ বিশ্বের একাধিক দেশের কাছে আটকে রয়েছে। প্রতিটি দেশের কাছে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া কঠিন হলেও, ইরানি গণমাধ্যমের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী একটি আনুমানিক চিত্র পাওয়া যায়:
চীন: অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার।
ভারত: ৭ বিলিয়ন ডলার।
ইরাক: প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
কাতার: ৬ বিলিয়ন ডলার (দক্ষিণ কোরিয়া থেকে স্থানান্তরিত, বর্তমানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় আটকে থাকা)।
যুক্তরাষ্ট্র: সরাসরি জব্দ করা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (যেমন- লুক্সেমবুর্গ): প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার।
জাপান: প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার (ইরানি তেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক)।
ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ক্ষমতা থমকে গেছে এবং শিল্প ও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন স্থবির হয়ে পড়েছে।
মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি এবং স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের মান ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার কারণে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অর্থায়নে পরিচালিত “সন্ত্রাসীরাই” এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। এমনকি সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিশ্চিত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কিছু বিক্ষোভকারীকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল।
এমন এক টালমাটাল প্রেক্ষাপটে, জব্দ করা এই সম্পদগুলো হলো এমন নগদ অর্থ যা ইরান তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। ১০০ বিলিয়ন ডলারের এই অংকটি ইরানের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ রোক্সেন ফরমানফারমাইয়ান আল জাজিরাকে জানান, ইরানের জন্য এই সম্পদ অবমুক্ত হওয়াটা বিশাল তাৎপর্য বহন করে। তিনি বলেন, “এর মানে হলো, তেল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত হার্ড কারেন্সি বা বৈদেশিক মুদ্রা ইরান নিজেদের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনতে পারবে। এর ফলে মুদ্রার ওঠানামার ওপর তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, যা গত ডিসেম্বরের মতো বিক্ষোভের সূত্রপাত ঠেকাতে সাহায্য করবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানের তেলক্ষেত্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। সম্পদ হাতে পেলে এই খাতগুলোর আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে। তাছাড়া যুদ্ধের পর দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্যও এই অর্থের বিকল্প নেই। জব্দ করা এই তহবিল দেশের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা ঘোরাতে এবং সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করবে।
ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোনের মতে, ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও কাজ করবে। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে, এই সম্পদ ছাড় দেওয়ার মানে হতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতির ওপর থেকে চাপ কমাচ্ছে। এটি অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তি এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য ও সম্পর্ক উন্নয়নের পথ সুগম করবে।” তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে এও বলেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অপ্রত্যাশিত আচরণের কারণে মিত্র বা শত্রু কারও পক্ষেই যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আগাম ধারণা করা অত্যন্ত কঠিন।