শিরোনামঃ
খালেদা জিয়ার পক্ষে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন জাইমা রহমান কর কাঠামোতে সারচার্জ বাতিল করে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা দেশে হাম পরিস্থিতির চরম অবনতি: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর প্রাণহানি হজের প্রথম ফ্লাইট শুক্রবার দিবাগত রাতে সংশোধনের মাধ্যমে শিগগিরই চূড়ান্ত হচ্ছে সম্প্রচার নীতিমালা: পে-চ্যানেল হবে বেসরকারি টিভি দিল্লির প্রস্তাব সুকৌশলে ওড়ালেন শেখ হাসিনা দেড় মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ: বিনিয়োগ খরার মুখে বেসরকারি খাত সংখ্যাধিক্যই কি ব্যাংক খাতের প্রধান কাল? ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ: কী, কেন এবং কোথায়? জ্বালানি সংকট: ঢাকা রুটে ফ্লাইট কমাচ্ছে এয়ারলাইনগুলো
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন

হাম নির্মূলের বছরেই দেশে কেন এই মৃত্যুমিছিল?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব এক চরম উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর সাধারণ প্রাদুর্ভাবের পর্যায়ে নেই, বরং এটি স্পষ্টতই মহামারির রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে সংক্রমণের হার গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলমান এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতেই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত, সুনির্দিষ্ট এবং বহুমুখী সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক অকল্পনীয় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


পরিসংখ্যানে ভয়াবহতার চিত্র: এক মাসেই ১৮৬ মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে হামের বর্তমান ভয়াবহতার একটি পরিষ্কার চিত্র ফুটে ওঠে। শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭১ জন।

গত ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত—মাত্র এক মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়:

  • সন্দেহজনক আক্রান্ত ও মৃত্যু: এই এক মাসে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২৪ জনে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৫৬ জনের। গত ২৪ ঘণ্টাতেই মারা গেছে ৫ জন শিশু।

  • নিশ্চিত আক্রান্ত ও মৃত্যু: একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৭২১ জন। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের। গত ২৪ ঘণ্টাতেও ২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

  • সার্বিক পরিস্থিতি: ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক মিলিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার এবং একই সময়ে সর্বমোট মৃত্যু হয়েছে ১৮৬ জনের।

তবে জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি আরও করুণ। অনেক রোগী হাসপাতালে না আসায় বা পরীক্ষার আওতার বাইরে থাকায় প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।


নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা বনাম চরম বাস্তবতা

এশিয়া অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে হাম ও রুবেলা ভাইরাস সম্পূর্ণ নির্মূলের একটি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে সেই লক্ষ্যের দিকে ইতিবাচক অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছিল।

  • ২০২২ সালে প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ছিল মাত্র ১.৪১।

  • ২০২৩ সালে তা ছিল ১.৬০ এবং ২০২৪ সালে ১.৪৩।

  • এমনকি ২০২৫ সালেও এই হার ছিল মাত্র ০.৭২।

কিন্তু বর্তমানে এই সংক্রমণের হার অভাবনীয়ভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬.৮ শতাংশে! ঠিক যেই বছরটিতে (২০২৬) হাম নির্মূলের চূড়ান্ত ঘোষণা আসার কথা ছিল, সেই লক্ষ্যমাত্রার বছরেই এমন ভয়াবহ ও লাগামহীন সংক্রমণ জনমনে চরম আতঙ্ক ও হতাশা তৈরি করেছে।


কেন এই আকস্মিক ও প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব?

এতদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি রোগ হঠাৎ করে কীভাবে মহামারির রূপ নিল, তার পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা:

১. টিকাদান কর্মসূচিতে বিশাল ও বিপজ্জনক ঘাটতি: বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ব্যত্যয়ই হামের প্রকোপ বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (MR-1) এবং এমআর-২ (MR-2) টিকার কভারেজ ধারাবাহিকভাবে ৮৫ থেকে ৯৭ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে এই টিকাদানের হার উদ্বেগজনকভাবে কমে যায়। ওই বছর এমআর-১ টিকার কভারেজ নেমে আসে ৫৬.৫ শতাংশে এবং এমআর-২ দাঁড়ায় ৫৭.১ শতাংশে। এর অর্থ হলো, দেশের প্রায় ৪৩.৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগে যেখানে ৯৭-৯৮ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় থাকায় একটি শক্তিশালী ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (Herd Immunity) তৈরি হয়েছিল, তা গত প্রায় ১৮ মাসে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ফলে সংক্রমণ এখন দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে।

২. ধারাবাহিক সংকট ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন: বাংলাদেশে প্রতি চার বছর অন্তর হামের বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ বা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। কিন্তু ২০২০ সালের বৈশ্বিক করোনা মহামারি, এরপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চলতি বছরের শুরুতে নতুন সরকারের নির্বাচন—এসব ধারাবাহিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলশ্রুতিতে, গণটিকাদান কার্যক্রম সময়মতো সম্পন্ন না হওয়ায় টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা পাহাড়সম আকার ধারণ করে।

৩. ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা: শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) শক্তিশালী করতে ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশে বছরে দুবার এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। গত দুই বছরে মাত্র দুবার এই ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এই ঘাটতি হামের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

৪. অপুষ্টির নীরব ঘাতক: অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীর এমনিতেই দুর্বল থাকে। তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করায় তারা সহজেই যেকোনো ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুবরণ করা শিশুদের মধ্যে একটি বড় অংশই চরম অপুষ্টির শিকার।


এটি কি আসলেই মহামারি? বিশেষজ্ঞদের দ্ব্যর্থহীন মত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো রোগের স্বাভাবিক সংক্রমণ হঠাৎ করে যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তবে তাকে মহামারি বা এপিডেমিক (Epidemic) বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সাধারণত প্রতি বছর যদি ১০০ জন মানুষ কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, আর হঠাৎ করে তা বেড়ে যদি ৫০০ বা হাজার ছাড়িয়ে যায়, তবে সেটি মহামারি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১৫-২০ বছরে বাংলাদেশে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হামে আক্রান্ত হয়নি এবং এত শিশুর মৃত্যুও ঘটেনি। শিশুরা দীর্ঘ সময় টিকা না পাওয়ায় ভাইরাসটি এখন অত্যন্ত মারাত্মক শক্তি ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছেন, দেশে হামের মহামারি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেন চরম আতঙ্ক বা প্যানিক (Panic) ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য সরকারিভাবে হয়তো এখনো সরাসরি ‘মহামারি’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে না।


সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে করণীয়

এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকাতে এখন আর গতানুগতিক পদক্ষেপে কাজ হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি এবং বহুমুখী পদক্ষেপ:

১. জাতীয় চিকিৎসা গাইডলাইন প্রণয়ন: বর্তমানে টিকাদানের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে হামে আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচানোর ওপর। প্রতিদিন শিশুদের মৃত্যু প্রমাণ করে যে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের চিকিৎসকেরা যেন একই মানের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন, সে জন্য হামের চিকিৎসায় অবিলম্বে একটি ‘জাতীয় গাইডলাইন’ (National Guideline) তৈরি করে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকেও এই গাইডলাইনের আওতায় আনতে হবে। চিকিৎসার মান যদি অন্তত ২৫ শতাংশও উন্নত করা যায়, তবে মৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

২. জরুরি টিকাদান ও ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ: খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের প্রতিটি প্রান্তের সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা এখন সবচেয়ে জরুরি। এর জন্য বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থগিত থাকা ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন জরুরি ভিত্তিতে চালু করতে হবে, যাতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

৩. আইসোলেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ: হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা সহজেই শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই করোনাভাইরাসের সময় আমরা যেমন স্বাস্থ্যবিধি ও আইসোলেশন মেনে চলতাম, হামের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম প্রটোকল মানতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তাদের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিক সাপোর্ট ও নিয়মিত ব্রিফিং: হাসপাতালগুলোতে হামের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত এসব পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এছাড়া, করোনা মহামারির সময় যেভাবে প্রতিদিন নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিন বা ব্রিফিং করা হতো, বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়েও ঠিক একইভাবে নিয়মিত ব্রিফিং হওয়া উচিত। সরকার কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের করণীয় কী, তা জানার পূর্ণ অধিকার জনগণের রয়েছে।

উপসংহার: হাম এখন আর কেবল একটি সাধারণ রোগ নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি প্রাণঘাতী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই আউটব্রেক বা প্রাদুর্ভাবের সঠিক ইনভেস্টিগেশন না হওয়ায় পরিস্থিতি আজ এত দূর গড়িয়েছে। তবে আর কালক্ষেপণ করার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মাঠপর্যায়ের কর্মী, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই সম্মিলিত ও বহুমুখী উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল এই মহামারি রুখে দিয়ে দেশের লাখ লাখ শিশুর অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব।


এ জাতীয় আরো খবর...