শিরোনামঃ
খালেদা জিয়ার পক্ষে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করলেন জাইমা রহমান কর কাঠামোতে সারচার্জ বাতিল করে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা দেশে হাম পরিস্থিতির চরম অবনতি: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর প্রাণহানি হজের প্রথম ফ্লাইট শুক্রবার দিবাগত রাতে সংশোধনের মাধ্যমে শিগগিরই চূড়ান্ত হচ্ছে সম্প্রচার নীতিমালা: পে-চ্যানেল হবে বেসরকারি টিভি দিল্লির প্রস্তাব সুকৌশলে ওড়ালেন শেখ হাসিনা দেড় মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ: বিনিয়োগ খরার মুখে বেসরকারি খাত সংখ্যাধিক্যই কি ব্যাংক খাতের প্রধান কাল? ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ: কী, কেন এবং কোথায়? জ্বালানি সংকট: ঢাকা রুটে ফ্লাইট কমাচ্ছে এয়ারলাইনগুলো
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৮ অপরাহ্ন

দেড় মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ: বিনিয়োগ খরার মুখে বেসরকারি খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর ও জটিল ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রাজস্ব আদায়ের চরম শ্লথগতি এবং অপরিহার্য ব্যয়ের চাপ মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে দেদারসে ঋণ নিচ্ছে, অন্যদিকে তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ সরবরাহ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ঘটনা দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ঋণের অভাবে বেসরকারি খাতে রীতিমতো হাহাকার চলছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে বেসরকারি খাতে এমন চরম বিনিয়োগ খরা চলতে থাকলে তা দেশে মারাত্মক জাতীয় সংকট, শিল্প স্থবিরতা এবং ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি করবে।

লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল সরকারের ব্যাংকঋণ: পরিসংখ্যান কী বলছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করলে সরকারি ঋণগ্রহণের এক ভয়াবহ ও লাগামহীন চিত্র ফুটে ওঠে। সরকারের নিজস্ব আয় বা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় দেশ পরিচালনার ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকে শুধু ছাড়িয়েই যায়নি, বরং এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ মার্চ মাসের শেষেই এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরবর্তীতে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে বাজার থেকে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

ঋণের উৎস ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ

ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া সরকারের এই বিপুল পরিমাণ ঋণের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার মূলত দুটি খাত থেকে এই অর্থ সংগ্রহ করেছে। মোট ঋণের মধ্যে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এসেছে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। আর বাকি ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে।

বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বড় অংশই এসেছে বিভিন্ন সরকারি বন্ড ও বিলের মাধ্যমে। এর মধ্যে:

  • ট্রেজারি বন্ড: ৫৬ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা।

  • স্পেশাল ট্রেজারি বন্ড: ১২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।

  • ট্রেজারি বিল: ৪ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়া (যাকে অর্থনীতিতে টাকা ছাপানো বা ‘প্রিন্টিং মানি’ বলা হয়) মূল্যস্ফীতিকে সরাসরি উসকে দেয়। তাই সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেওয়ার দিকে বেশি ঝুঁকেছে। কিন্তু এর ফলে তৈরি হয়েছে আরেক নতুন সংকট—’ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ (Crowding Out Effect)। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যখন তাদের বেশিরভাগ আমানত সরকারকে ঝুঁকিমুক্তভাবে ধার দেয়, তখন সাধারণ ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকে আর কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না।

বেসরকারি খাতে চরম স্থবিরতা: বিনিয়োগে খরা

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হতে শুরু করে, যা বর্তমানে তলানিতে এসে ঠেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি। একটি বিকাশমান অর্থনীতির জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাধারণত ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার এবং খেলাপি ঋণের পাহাড়সম চাপের কারণে এই খাতে গতি ফিরছে না।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বর্তমান ব্যবসা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “ব্যাংক খাতে এখন ভীষণ তারল্য সংকট চলছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কঠিন কিছু নীতি প্রবর্তন করেছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত কঠোর নীতি ও আন্তর্জাতিক মানের শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে অর্থায়ন পেতে অযোগ্য হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া প্রায় অর্ধেক ব্যাংকই এখন তীব্র মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এসব ব্যাংক চাইলেও নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছে না।”

তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, “বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। একটি দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি অর্জন করতে হলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বিকল্প নেই। আর এ জন্য সরকারের উচিত বেসরকারি খাতের দিকে সর্বোচ্চ নজর দেওয়া।”

বেকারত্বের চরম রূপ: পরিসংখ্যান ও মানবিক বিপর্যয়

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খরা বা ঋণের অভাব কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর আঘাত হানছে। শিল্পকারখানা সম্প্রসারিত না হওয়া, নতুন স্টার্টআপ তৈরি না হওয়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো (SME) অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বিবিএস-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজার। এর আগের বছরের ঠিক একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার। প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় সমাজে হতাশা ও অস্থিরতা বাড়ছে।

ঋণ ফাঁদের সতর্কতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ

সরকারের এই লাগামহীন ঋণনীতি নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “আমরা যাতে কোনোভাবেই বিদেশি বা দেশি ঋণের ফাঁদে (Debt Trap) না পড়ি, এটাই হওয়া উচিত বর্তমান সরকারের মূল টার্গেট। আমরা বুঝতে পারছি যে, জ্বালানি ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে সরকারকে বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। তা ছাড়া নতুন সরকারের ইশতেহারে যেসব ওয়াদা ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নেরও চাপ রয়েছে। কিন্তু ঋণ করে ঘি খাওয়ার এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে নিজস্ব সম্পদ আহরণের দিকে। বিশেষ করে কর-জিডিপি অনুপাত ও রাজস্ব বৃদ্ধির দিকে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।”

রাজস্ব ঘাটতি ও বিশাল ঋণের বোঝা

সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পেছনের মূল কারণ হলো রাজস্ব আদায়ে চরম ব্যর্থতা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় সরকারকে প্রতিনিয়ত ঋণের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকায়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা। এর মধ্যে:

  • বৈদেশিক ঋণ: ৯ হাজার ৩46 কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করলে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা। ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে এই ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়েছে।

  • সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ: ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

  • ব্যাংক ও অন্যান্য দেশীয় উৎস: প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা।

এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে প্রতি বছর সুদ পরিশোধ করতেই এখন সরকারের বাজেটের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ) চলে যাচ্ছে। সুদ পরিশোধের এই বিশাল ব্যয়ের কারণে সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে পারছে না।

বৈশ্বিক হেডউইন্ডস এবং আগামী দিনের শঙ্কা

দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাও অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগামী জুন মাস পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

সার্বিক বিবেচনায়, সরকার যদি দ্রুত রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় এবং সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন না করে, তবে ব্যাংক থেকে এই ঋণ নেওয়ার প্রবণতা চলতেই থাকবে। আর এর চূড়ান্ত মূল্য চোকাতে হবে দেশের বেসরকারি খাতকে। বেসরকারি খাত সংকুচিত হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে এবং বেকারত্বের মতো জাতীয় সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে দেশের আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।


এ জাতীয় আরো খবর...