আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনপ্রিয়তা বাড়াতে এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল হাতে নিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই কৌশলের অংশ হিসেবে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কোণঠাসা, পদবঞ্চিত ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের দলে টানার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে দলটি। শুধু বিএনপিই নয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির ‘নির্দোষ’ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতারাও এনসিপির এই ছাতার নিচে আসার সুযোগ পেতে পারেন।
এনসিপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতার মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। যথার্থ মূল্যায়ন না পাওয়ার আক্ষেপে ভোগা এসব নেতার কেউ কেউ এরই মধ্যে এনসিপির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। অন্যদিকে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বও নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন বড় দলের সৎ ও পরিচ্ছন্ন নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দর-কষাকষি চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্রের বিকল্প হওয়ার প্রতিশ্রুতি
বড় দলের নেতাদের দলে টানার এই প্রক্রিয়ার বিষয়ে এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সারজিস আলম জানান, যেকোনো রাজনৈতিক দলেই অনেক যোগ্য নেতা থাকেন, যারা স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্রের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথ মূল্যায়ন পান না। এনসিপি সেই ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতা-কর্মীদের সুযোগ করে দিতে চায়। তিনি বলেন, “পুরো দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যেসব ত্যাগী নেতা-কর্মী আছেন, দল যাদের মূল্যায়ন করতে পারছে না, আমরা তাদের কাছে যাচ্ছি। তারাও অনেকে আমাদের কাছে অ্যাপ্রোচ করছেন। তাদের জন্য এনসিপির দরজা সব সময় উন্মুক্ত।”
হাসনাত-মনজুর সাক্ষাৎ ও চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ
বড় নেতাদের দলে ভেড়ানোর এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনজুর আলমকে এনসিপির দলীয় প্রার্থী করার বিষয়েই এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মনজুর আলম গণমাধ্যমকে এই সাক্ষাতের বিষয়ে জানান, হাসনাত আবদুল্লাহ নিজেই তাকে ফোন করে বাসায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর তিনি তাকে দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ জানান এবং বিকেল ৩টার দিকে তারা একসঙ্গে খাবার খান। মনজুর আলমকে প্রার্থী করার বিষয়ে সারজিস আলম বলেন, “আগে তো তাকে (মনজুর) আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে আসতে হবে। এরপর দেখতে হবে ওই এলাকায় আর কারা আগ্রহী। সার্বিক বিবেচনায় তিনি এগিয়ে থাকলে প্রার্থী হতে পারেন, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।”
তবে এই সাক্ষাৎ ঘিরে উত্তেজনারও সৃষ্টি হয়। হাসনাত আবদুল্লাহ ওই বাসায় যাওয়ার পর নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করে একদল লোক সেখানে জড়ো হয়ে মনজুর আলমকে ফ্যাসিবাদের ‘দোসর’ আখ্যা দেন। পরবর্তীতে এনসিপির যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবশক্তি’ এক সংবাদ বিবৃতিতে অভিযোগ করে যে, যুবদলের নেতা-কর্মীরা ‘মব’ তৈরি করে হাসনাত আবদুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়েছে। অবশ্য এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য বা হামলা নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘নির্দোষ’ হলে জায়গা মিলবে নিষিদ্ধ দলের নেতাদেরও
শুধু বিএনপি নয়, শর্তসাপেক্ষে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির নেতাদেরও দলে ভেড়াতে পারে এনসিপি। এ বিষয়ে দলের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট করে সারজিস আলম বলেন, “যাঁরা অপরাধী, যাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ বা মামলা আছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে—তাঁদের জন্য এনসিপিতে কোনো সুযোগ নেই। সেটা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য যেকোনো দলেরই হোক না কেন। তবে যাঁদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, সমাজে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা আছে এবং বিগত দেড় বছরে যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তাঁদের দলে নিতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।”
আসছে আরও চমক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হয়ে নির্বাচন করে ছয়টি আসনে জয়লাভ করে চমক দেখিয়েছিল এনসিপি। সংসদ নির্বাচনের আগেও চারবারের সাবেক এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) মনজুর কাদের বিএনপি ছেড়ে এনসিপিতে যোগ দিয়ে সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন। স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সেই চমক অব্যাহত রাখতে চায় দলটি।
জানা গেছে, মনজুর আলম ছাড়াও চট্টগ্রামের অন্তত তিনজন হেভিওয়েট বিএনপি নেতার সঙ্গে এনসিপির নিবিড় আলোচনা চলছে। এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সেলের কো-লিড আলাউদ্দীন মোহাম্মদ জানান, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা নিজ থেকেই তাদের দলে আসার আগ্রহ প্রকাশ করছেন এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী ও জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলামও এই ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, “এনসিপিতে বেশ কিছু চমক আসছে। আরও কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব দ্রুতই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে তাদের দলে বরণ করে নেওয়া হবে।”