শিরোনামঃ
সংসদের আঙিনায় নারীরা: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ৪৯, আটকে আছে একটির ভাগ্য শঙ্কামুক্ত মির্জা আব্বাস: শিগগিরই ফিরছেন চেনা রাজনৈতিক আঙিনায় খন্দকার মোশাররফের ১০৫ হিসাব অবরুদ্ধ কিউই বধের পুরস্কার: র‍্যাংকিংয়ে টাইগারদের বিশাল উল্লম্ফন প্রার্থনা করি যাতে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ঠিক না হয়: আসামের মুখ্যমন্ত্রী ওপেকের বাঁধন ছিন্ন: ট্রাম্পকে খুশি করতে সৌদির মুখোমুখি আমিরাত তেহরানকে রক্ষায় ‘সর্বশক্তি’ নিয়োগ করবে মস্কো: পুতিন শর্তের বেড়াজালে তেহরান-ওয়াশিংটন তন্দ্রা নাকি গভীর ঘুম: অজুর বিধানে ইসলামের মাপকাঠি কর্তৃপক্ষের অবহেলায় লিমন-বৃষ্টির মৃত্যু, অভিযোগ নিহতদের পরিবারের
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন

সাপের ছোবলের চেয়েও ভয়ংকর অ্যান্টিভেনম পাওয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

সাপের ছোবল হয়তো কয়েক সেকেন্ডের একটি ঘটনা, কিন্তু এরপর রোগীর স্বজনদের জন্য শুরু হয় এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন। বিষের যন্ত্রণার চেয়েও তাদের কাছে বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে এক নিদারুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া—জীবন রক্ষাকারী ‘অ্যান্টিভেনম’ জোগাড় করা। গ্রামীণ জনপদে সাপের কামড় একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও, আশ্চর্যের বিষয় হলো এর একমাত্র প্রতিষেধকটি বন্দি থাকে যোজন দূরের শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীকে নিয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে যখন জানা যায় সেখানে ওষুধের কোনো মজুত নেই, তখন শুরু হয় সময়ের সাথে এক অসম লড়াই। একদিকে বিষে নীল হয়ে আসা প্রিয়জনের শরীর, অন্যদিকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শহরের হাসপাতালে পৌঁছানোর মরিয়া তাগিদ। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর এই অমানবিক লড়াইয়ে অনেক সময়ই সাপের বিষের চেয়ে দ্রুত ফুরিয়ে যায় রোগীর আয়ু, আর স্বজনদের কাছে অ্যান্টিভেনম খোঁজার এই সংগ্রাম পরিণত হয় সাপের ছোবলের চেয়েও ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতায়।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গ্রামীণ উপজেলাগুলোর ভৌগোলিক কাঠামোর কারণে সেখানে সাপের উপদ্রব তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এসব এলাকার ঝোপঝাড়, পাহাড়ের পাদদেশ এবং বসতবাড়ির আশেপাশে প্রায়ই অত্যন্ত বিষধর সব সাপের দেখা মেলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সবুজ বোড়া বা গ্রিন পিট ভাইপার, রাজগোখরা, পদ্মগোখরা, শঙ্খিনী এবং গ্রামীণ জনপদের নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত কালাচ সাপ। একসময় গ্রামাঞ্চলে সাপে কাটলে মানুষ বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার বদলে ওঝা বা বৈদ্যের ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যার ফলে মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। তবে সময়ের সাথে সাথে এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণার কারণে মানুষের চিন্তাধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ সাপে কাটলে দ্রুত নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছুটে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সচেতনতার এই সুফল তারা পুরোপুরি ভোগ করতে পারছে না। কারণ, গ্রামীণ হাসপাতালগুলোতে গিয়ে তারা জানতে পারেন যে জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম সেখানে নেই। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের ছুটতে হয় বিভাগীয় বা জেলা শহরের দিকে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা এই কাঠামোগত দুর্বলতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে। রাতের বেলা নিজের ঘরে শুয়ে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় এক তরুণের সাপের কামড়ের শিকার হওয়া, কিংবা হাসিখুশি এক স্কুলছাত্রীর অকাল মৃত্যু, অথবা একজন নিবেদিতপ্রাণ স্কুলশিক্ষিকার প্রাণহানি—এই প্রতিটি ঘটনার পেছনের গল্পটি প্রায় একই রকম। সাপে কাটার পর তাদের প্রত্যেককেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে অ্যান্টিভেনম না থাকায় চিকিৎসকরা তাদের দ্রুত জেলা বা বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালে স্থানান্তর করার পরামর্শ দেন। গ্রামীণ ভাঙাচোরা রাস্তা আর যানজট পেরিয়ে শহরে পৌঁছাতে যে দুই থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে, সেই সময়ের মধ্যেই সাপের বিষ মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বা রক্তকণিকাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ফলে শহরের হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকদের আর মৃত ঘোষণা করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। সঠিক সময়ে মাত্র কয়েক ডোজ ওষুধ এই তরতাজা প্রাণগুলোকে বাঁচাতে পারত।

উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর এই করুণ দশার পেছনে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা এবং ব্যবস্থাপনার অভাব প্রকটভাবে দায়ী। স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই অসহায়। তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত অ্যান্টিভেনমের চাহিদা পাঠালেও, সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা হয় না। বর্ষাকালে যখন সাপের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি থাকে এবং রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে, তখন ওষুধের এই সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে। প্রশাসনিক ক্রয় প্রক্রিয়া এবং বণ্টনের জটিলতার কারণে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র এক বা দুই ডোজ অ্যান্টিভেনম বরাদ্দ থাকে, যা কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। একজন সাপে কাটা রোগীর জীবন বাঁচাতে অনেক সময় ১০ থেকে ২০ ডোজ পর্যন্ত অ্যান্টিভেনমের প্রয়োজন হতে পারে। সেখানে পুরো উপজেলার জন্য মাত্র কয়েক ডোজ ওষুধের বরাদ্দ থাকাটা রোগীদের সাথে এক ধরনের প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

শুধু চট্টগ্রাম বা এর আশপাশের এলাকাই নয়, পুরো বাংলাদেশের চিত্রই প্রায় এক। বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং এর মধ্যে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। সাপের কামড়ের শিকার হওয়া এই মানুষগুলোর সিংহভাগই হলেন দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর, জেলে এবং গ্রামের সাধারণ মানুষ। এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য সাপের কামড় শুধু একটি স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ই নয়, বরং এটি তাদের পরিবারের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কাও বটে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে এবং পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবার পথে বসে যায়। অথচ, সঠিক সময়ে বিনামূল্যে এই সরকারি চিকিৎসা পেলে দেশের অর্থনীতি এবং সমাজ উভয়েরই বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।

শহরকেন্দ্রিক এই চিকিৎসা ব্যবস্থার পেছনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কিছু কাঠামোগত কারণও রয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। অ্যান্টিভেনম একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ওষুধ, যার কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন ‘কোল্ড চেইন’ বা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। অনেক গ্রামীণ হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ বা উন্নত রেফ্রিজারেটরের অভাবে এই কোল্ড চেইন বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের পর অনেক রোগীর শরীরে তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া বা ‘অ্যানাফিল্যাকটিক শক’ দেখা দিতে পারে, যা তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বা উচ্চতর চিকিৎসার যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয়, যা উপজেলা হাসপাতালগুলোতে থাকে না। ফলে অনেক সময় গ্রামীণ চিকিৎসকরা ঝুঁকি নিতে চান না এবং দ্রুত রোগীকে বড় হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।

বাংলাদেশের অ্যান্টিভেনম সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো বিদেশি ওষুধের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা। বাংলাদেশ বর্তমানে সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানি করে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে যে, একই প্রজাতির সাপ হলেও ভৌগোলিক অবস্থান এবং পরিবেশের কারণে তাদের বিষের তীব্রতা ও ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে ভারতের সাপের বিষ দিয়ে তৈরি অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশের সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে সবসময় শতভাগ কার্যকর হয় না। অনেক সময় ভারতীয় অ্যান্টিভেনম দিয়ে বাংলাদেশের রোগীকে সুস্থ করতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ডোজ প্রয়োগ করতে হয়, যা একদিকে যেমন ওষুধের ঘাটতি তৈরি করে, অন্যদিকে রোগীর শারীরিক জটিলতাও বাড়িয়ে দেয়। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব সাপের বিষ থেকে স্থানীয়ভাবে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

সাপের কামড় বা ‘স্নেকবাইট এনভেনোমিং’-কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৭ সালে একটি অন্যতম প্রধান ‘অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ’ বা নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ (এনটিডি) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের হার বিশ্বব্যাপী অর্ধেকে নামিয়ে আনা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহাহারান আফ্রিকার দেশগুলোতেই এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। ভারত, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো এই সমস্যা মোকাবিলায় তাদের নিজস্ব অ্যান্টিভেনম উৎপাদন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশকেও যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হয়, তবে দ্রুত এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে নিজস্ব স্বাস্থ্য নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে হলে সরকারি উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে প্রতিটি উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিভেনমের মজুত নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে এই ওষুধ সংরক্ষণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ চালিত বিশেষ রেফ্রিজারেটরের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসকদের অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মোকাবিলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু অন্তত শুরু করতে পারেন। পাশাপাশি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ বা অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশের সাপের বিষ নিয়ে যে গবেষণা চলছে, তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে, যাতে খুব দ্রুত আমরা নিজস্ব অ্যান্টিভেনম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি।

সাপের কামড় কোনো ছোঁয়াচে বা দুরারোগ্য ব্যাধি নয়; এটি একটি নিরাময়যোগ্য দুর্ঘটনা মাত্র। শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব এবং কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার কারণে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। গ্রাম থেকে শহরের হাসপাতালের এই দীর্ঘ পথ যেন আর কোনো মানুষের মৃত্যুর কারণ না হয়, তার জন্য এখনই সমন্বিত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় জীবন রক্ষাকারী এই চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।


এ জাতীয় আরো খবর...