শিরোনামঃ
সংসদের আঙিনায় নারীরা: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ৪৯, আটকে আছে একটির ভাগ্য শঙ্কামুক্ত মির্জা আব্বাস: শিগগিরই ফিরছেন চেনা রাজনৈতিক আঙিনায় খন্দকার মোশাররফের ১০৫ হিসাব অবরুদ্ধ কিউই বধের পুরস্কার: র‍্যাংকিংয়ে টাইগারদের বিশাল উল্লম্ফন প্রার্থনা করি যাতে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ঠিক না হয়: আসামের মুখ্যমন্ত্রী ওপেকের বাঁধন ছিন্ন: ট্রাম্পকে খুশি করতে সৌদির মুখোমুখি আমিরাত তেহরানকে রক্ষায় ‘সর্বশক্তি’ নিয়োগ করবে মস্কো: পুতিন শর্তের বেড়াজালে তেহরান-ওয়াশিংটন তন্দ্রা নাকি গভীর ঘুম: অজুর বিধানে ইসলামের মাপকাঠি কর্তৃপক্ষের অবহেলায় লিমন-বৃষ্টির মৃত্যু, অভিযোগ নিহতদের পরিবারের
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩১ অপরাহ্ন

তন্দ্রা নাকি গভীর ঘুম: অজুর বিধানে ইসলামের মাপকাঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

ইসলামে শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একজন মুমিন যখন তার স্রষ্টার সামনে প্রার্থনায় দাঁড়ান, তখন তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিকের পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। পবিত্রতা বা তাহারাত ছাড়া নামাজ আদায় কিংবা পবিত্র কোরআন স্পর্শ করা ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই পবিত্রতা অর্জনের প্রাথমিক ও প্রধান মাধ্যম হলো অজু। পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে নামাজের পূর্বে মুখমণ্ডল, কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করা, মাথা মাসেহ করা এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অজুর মাধ্যমে মানুষ মূলত জাগতিক ব্যস্ততা থেকে নিজেকে ছিন্ন করে সম্পূর্ণ সচেতন অবস্থায় ইবাদতের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ঘুম। ঘুমের কারণে এই পবিত্রতা বা অজু নষ্ট হয় কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়।

ঘুম ও অজুর সম্পর্কের বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে মানুষের শারীরিক অবস্থা ও ইসলামি বিধিনিষেধের মূল দর্শনটি অনুধাবন করা প্রয়োজন। ঘুম নিজস্ব সত্তায় কোনো নাপাকি বা অপবিত্র বস্তু নয়। তবে ঘুমের কারণে মানুষের শরীরের ওপর তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আর থাকে না। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে (বিশেষ করে রেম বা নন-রেম স্লিপের চূড়ান্ত পর্যায়ে), তখন শরীরের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায় এবং ঐচ্ছিক পেশিগুলো সম্পূর্ণ বিশ্রাম অবস্থায় চলে যায়। এই শিথিলতার কারণে মানুষের অজান্তেই শরীর থেকে বায়ু নির্গত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়। ইসলামি শরিয়তে বায়ু নির্গমনকে অজু ভঙ্গের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে। বুখারি ও মুসলিম শরিফের নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বায়ু নির্গমনের শব্দ শুনলে বা গন্ধ অনুভব করলে তার অজু নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং, ঘুম এমন একটি অচেতনার স্তর, যেখানে বায়ু নির্গমনের বিষয়ে মানুষ পুরোপুরি সন্দিহান থাকে। এই সন্দেহের জায়গা থেকেই গভীর ঘুমকে অজু ভঙ্গের একটি সম্ভাব্য ও যৌক্তিক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

হাদিস শরিফে ঘুমের কারণে অজু ভাঙার বিষয়ে বেশ কয়েকটি বর্ণনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত সুষ্পষ্ট। আবু দাউদ শরিফের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি ঘুমাবে সে যেন নতুন করে অজু করে নেয়। অন্যদিকে মুসলিম শরিফের আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসুল (সা.)-এর যুগে সাহাবিরা মসজিদে বসে নামাজের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন। কখনো কখনো তন্দ্রায় তাদের মাথা ঝুঁকে পড়ত, কিন্তু এরপরও তারা নতুন করে অজু না করেই নামাজ আদায় করতেন। ইসলামি আইনবিদ বা ফকিহগণ এই দুটি হাদিসের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় সাধন করেছেন। তারা ঘুমের গভীরতা এবং মানুষের বসার ভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে অজুর বিধান নির্দিষ্ট করেছেন। যে ঘুম মানুষের চেতনাকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয় এবং শরীরকে পুরোপুরি এলিয়ে দেয়, সেই গভীর ঘুমই মূলত অজু ভঙ্গের কারণ। কিন্তু কেউ যদি বসে থাকা অবস্থায় বা দাঁড়ানো অবস্থায় সামান্য ঝিমিয়ে পড়েন, তবে তার অজু অক্ষুণ্ণ থাকে।

ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম ও ফকিহগণের বিশ্লেষণে ঘুমের বিভিন্ন ধরন ও অজুর বিধান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কেউ যদি এমনভাবে ঘুমায় যে তার শরীরের গিঁট বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণ শিথিল হয়ে যায়, তবে তার অজু ভেঙে যাবে। এর একটি সহজ মাপকাঠি হলো—কেউ যদি কোনো কিছুর সাথে এমনভাবে হেলান দিয়ে বা ঠেস দিয়ে ঘুমায় যে, সেই বস্তুটি সরিয়ে নিলে সে মাটিতে পড়ে যাবে, তবে বুঝতে হবে সে গভীর ঘুমে ছিল এবং তার অজু নষ্ট হয়ে গেছে। একইভাবে চিৎ হয়ে বা কাত হয়ে শুয়ে ঘুমালেও অজুর অস্তিত্ব থাকে না। তবে কেউ যদি মাটিতে নিতম্ব শক্তভাবে স্থির রেখে সোজা হয়ে বসে ঘুমায়, তবে সেই অবস্থায় বায়ু নির্গমনের সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। ইমাম নববী (রহ.)-ও এই মতকে সমর্থন করে জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ চেতনাহীন ঘুম অজুর পরিপন্থী, তবে সুদৃঢ়ভাবে উপবিষ্ট অবস্থায় সামান্য তন্দ্রা অজুকে নষ্ট করে না।

ঘুম ছাড়াও আরও বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে মানুষের পবিত্রতা বা অজু নষ্ট হয়ে যায়, যা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি। মানবদেহের প্রাকৃতিক নির্গমনের পথ দিয়ে যেকোনো কিছু, যেমন—প্রস্রাব, পায়খানা, বায়ু, কৃমি, মজি বা মনি নির্গত হলে সাথে সাথেই অজু ভঙ্গ হয়। এছাড়া নারীদের বিশেষ শারীরিক চক্র বা সন্তান প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণের কারণেও পবিত্রতা নষ্ট হয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে অনেক রোগীকে পাইপ বা ক্যাথেটারের মাধ্যমে মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়; এমন পরিস্থিতিতেও নাপাকি শরীর থেকে বের হওয়ার কারণে অজুর বিধান নষ্ট হয় বলে ইসলামি স্কলাররা মত দিয়েছেন। শরীরের যেকোনো স্থান থেকে যদি এমন পরিমাণ রক্ত, পুঁজ বা বমি বের হয় যা গড়িয়ে পড়ে, তবে ইসলামি আইন অনুযায়ী তাকে পুনরায় অজু করতে হবে।

সবশেষে, মানুষের চেতনার সাথে অজুর অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের হুঁশ বা জ্ঞান যে কারণেই লোপ পাক না কেন, তা অজু ভঙ্গের কারণ হিসেবে পরিগণিত হয়। কেউ যদি অসুস্থতার কারণে অজ্ঞান বা বেহুঁশ হয়ে পড়েন, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, কিংবা কোনো ওষুধ, অ্যানেস্থেসিয়া বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের ফলে মাতাল ও সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন, তবে তার অজু তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে যায়। কারণ, জ্ঞান হারানোর ফলে তার শরীর থেকে কোনো অপবিত্র বস্তু নির্গত হলো কি না, সেই বিষয়ে তার আর কোনো ধারণা থাকে না। মূলত, ইসলাম পবিত্রতার বিধানে মানুষের সন্দেহ ও অনিশ্চয়তাকে দূর করে একটি সুস্পষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে, যাতে স্রষ্টার সামনে দাঁড়ানোর সময় একজন মানুষের মন ও শরীর উভয়ই থাকে পরিপূর্ণ প্রশান্ত ও পবিত্র।


এ জাতীয় আরো খবর...