শিরোনামঃ
নড়াইলে ক্লাস চলাকালে টিনের চালের ওপর গাছ, আহত ২ শিক্ষার্থী দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার: ৩ মাস বিশেষ সহায়তার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর সয়াবিনের বাজারে ফের আগুন: বোতল ও খোলা তেল লিটারে বাড়ল ৪ টাকা প্লাবনের পদধ্বনি: বিপৎসীমা ছাড়াল ৪ নদী, ৫ জেলায় অকাল বন্যার শঙ্কা চেতনা বিক্রির পণ্য নয়: সংসদে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ সম্বোধনের প্রস্তাব শামা ওবায়েদের ‘জুলাই থেকেই বিনামূল্যে ড্রেস ও ব্যাগ পাবে শিক্ষার্থীরা’: শিক্ষামন্ত্রী সংসদের আঙিনায় নারীরা: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ৪৯, আটকে আছে একটির ভাগ্য শঙ্কামুক্ত মির্জা আব্বাস: শিগগিরই ফিরছেন চেনা রাজনৈতিক আঙিনায় খন্দকার মোশাররফের ১০৫ হিসাব অবরুদ্ধ কিউই বধের পুরস্কার: র‍্যাংকিংয়ে টাইগারদের বিশাল উল্লম্ফন
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৮ অপরাহ্ন

প্রার্থনা করি যাতে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ঠিক না হয়: আসামের মুখ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা যেকোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক এক মন্তব্য সেই চিরায়ত কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবিপি-কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত প্রকাশ্যে এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থনা করেন যাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আর কোনো উন্নতি না হয়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কীভাবে রাতের অন্ধকারে বেআইনিভাবে মানুষদের বাংলাদেশে ‘পুশ-ব্যাক’ বা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করায়, তার এক চাঞ্চল্যকর বিবরণও তিনি নিজ মুখেই দিয়েছেন। গত ১৫ই এপ্রিল সম্প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারটির কিছু অংশ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই বিতর্কিত মন্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে এক ধরনের দৃশ্যমান শীতলতা বিরাজ করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তার সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূসের নাম উল্লেখ করেই তার বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, প্রতিদিন সকালে তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যেন ইউনূস সরকারের আমলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতি যেমন আছে ঠিক তেমনই থাকে এবং সম্পর্কের বিন্দুমাত্র উন্নতি যেন না হয়। একজন দায়িত্বশীল পদে থাকা রাজনীতিবিদের মুখে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সম্পর্কে এমন প্রকাশ্য অমঙ্গল কামনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন ও চরম উসকানিমূলক ঘটনা বলেই মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তবে এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনকারী দিকটি ছিল সীমান্তে পুশ-ব্যাকের বিষয়ে তার খোলামেলা স্বীকারোক্তি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দীর্ঘকাল ধরেই সীমান্ত হত্যা এবং পুশ-ব্যাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অমীমাংসিত ইস্যু। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বরাবরই বিএসএফের বিরুদ্ধে এই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করে আসছে, যা ভারত সরকার অনেক সময়ই আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করে। কিন্তু আসামের মুখ্যমন্ত্রী একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন কীভাবে বিএসএফ এই কাজ করে থাকে। তার ভাষ্যমতে, যাদেরকে পুশ-ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিএসএফ প্রথমে তাদেরকে দশ থেকে চল্লিশ দিন পর্যন্ত নিজেদের হেফাজতে আটকে রাখে। এরপর রাতের অন্ধকারে যখন ওপারে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের কোনো টহল থাকে না বা তারা দূরে অবস্থান করে, ঠিক সেই সুযোগে আটকে রাখা মানুষদের জোরপূর্বক ধাক্কা মেরে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির পুরোনো নাম ‘বিডিআর’ ব্যবহার করেছেন, যা হয়তো তার তথ্যের অপর্যাপ্ততা অথবা অবজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ।

আসামের ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই মন্তব্যের পেছনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আসামে অবৈধ অনুপ্রবেশ, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে দীর্ঘ দশক ধরে এক ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ চলে আসছে। কট্টরপন্থী এই বিজেপি নেতা মূলত তার রাজ্যের হিন্দুত্ববাদী ও জাতীয়তাবাদী ভোটব্যাংককে সন্তুষ্ট রাখতেই বারবার বাংলাদেশ এবং মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ইস্যুকে সামনে আনেন। নিজের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে তিনি যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে দেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না, এই সাক্ষাৎকারটি তারই একটি বড় প্রমাণ। কিন্তু তার এই অতি-উৎসাহী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য খোদ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নয়াদিল্লির সাউথ ব্লক বর্তমানে ঢাকার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য এক ভিন্নধর্মী ও তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক চাল চেলেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রবীণ বিজেপি নেতা এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে মনোনীত করেছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ, প্রথাগতভাবে ভারত সবসময় তাদের পররাষ্ট্র ক্যাডারের পেশাদার ও ঝানু কূটনীতিকদেরই ঢাকায় নিয়োগ দিয়ে থাকে। এই প্রথমবারের মতো একজন হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে দিল্লি মূলত ঢাকার কাছে একটি জোরালো রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে। দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন সরাসরি রাজনৈতিক সংযোগ থাকা ব্যক্তিকে পাঠানোর অর্থ হলো, নরেন্দ্র মোদির সরকার ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার বাইরে গিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক পর্যায়ে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।

দিল্লির এই ইতিবাচক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ঠিক বিপরীত মেরুতেই অবস্থান করছে হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্য। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যখন একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছে, তখন আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই ধরনের উগ্র মন্তব্য সেই সেতুটি নির্মাণের আগেই ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করেছে। বাংলাদেশ এমনিতে সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ভারতের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অসন্তুষ্ট। তার ওপর ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে যখন বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, তখন ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এমন প্রকাশ্য বিদ্বেষ দুই দেশের জনগণের মধ্যকার দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমন্ত বিশ্বশর্মার পুশ-ব্যাকের স্বীকারোক্তিটি আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামগুলোতে ভারতের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হতে পারে এবং বাংলাদেশ চাইলে এটিকে ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কড়া প্রতিবাদ জানাতে পারে।

প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না—এই চিরন্তন সত্যটি কূটনীতির প্রাথমিক পাঠ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এতটাই নিবিড় ও বহুমাত্রিক যে, একে অপরের ক্ষতি করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহুলাংশে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। এমন একটি আন্তঃনির্ভরশীল সমীকরণে দাঁড়িয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই উসকানিমূলক মন্তব্য কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারকেই লুণ্ঠন করেনি, বরং ভারতের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকেও হুমকিতে ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়, নয়াদিল্লি নিজেদের কূটনৈতিক বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষায় হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই লাগামহীন মন্তব্যকে কীভাবে সামাল দেয়, নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে এই নীরব বিষবাষ্পকে দুই দেশের সম্পর্কের আকাশে আরও ঘনীভূত হতে দেয়।


এ জাতীয় আরো খবর...