শিরোনামঃ
নড়াইলে ক্লাস চলাকালে টিনের চালের ওপর গাছ, আহত ২ শিক্ষার্থী দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার: ৩ মাস বিশেষ সহায়তার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর সয়াবিনের বাজারে ফের আগুন: বোতল ও খোলা তেল লিটারে বাড়ল ৪ টাকা প্লাবনের পদধ্বনি: বিপৎসীমা ছাড়াল ৪ নদী, ৫ জেলায় অকাল বন্যার শঙ্কা চেতনা বিক্রির পণ্য নয়: সংসদে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ সম্বোধনের প্রস্তাব শামা ওবায়েদের ‘জুলাই থেকেই বিনামূল্যে ড্রেস ও ব্যাগ পাবে শিক্ষার্থীরা’: শিক্ষামন্ত্রী সংসদের আঙিনায় নারীরা: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ৪৯, আটকে আছে একটির ভাগ্য শঙ্কামুক্ত মির্জা আব্বাস: শিগগিরই ফিরছেন চেনা রাজনৈতিক আঙিনায় খন্দকার মোশাররফের ১০৫ হিসাব অবরুদ্ধ কিউই বধের পুরস্কার: র‍্যাংকিংয়ে টাইগারদের বিশাল উল্লম্ফন
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৬ অপরাহ্ন

সংসদের আঙিনায় নারীরা: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ৪৯, আটকে আছে একটির ভাগ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উন্মাদনা ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মূল পর্ব শেষ হওয়ার পর এখন চলছে সংরক্ষিত নারী আসনের আনুষ্ঠানিকতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইনসভায় নারীদের কণ্ঠস্বরকে সুনিশ্চিত করতে সংবিধানে যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান রাখা হয়েছে, তার মধ্যে ৪৯টি আসনের চিত্র ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এই ৪৯টি আসনে রাজনৈতিক দল ও জোটের মনোনীত প্রার্থীরা কোনো ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে চলেছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বিজয়ীদের নাম উল্লেখ করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হবে। তবে আইনি জটিলতার কারণে একটিমাত্র আসনের ফলাফল আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে, যা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে বুধবার বিকেলে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন খান। তিনি জানান, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য বুধবার পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত এই সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও বৈধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া কোনো প্রার্থীই তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। বাংলাদেশের নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী, যদি কোনো আসনে প্রার্থীর সংখ্যা এবং নির্বাচিত হওয়ার পদের সংখ্যা সমান হয় এবং কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন, তবে ভোটের প্রয়োজন হয় না। সেই নিয়মের আলোকেই এই ৪৯ জন নারী প্রার্থী সম্পূর্ণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নিজেদের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর আসন প্রাপ্তির ওপর ভিত্তি করে আনুপাতিক হারে এই সংরক্ষিত নারী আসনগুলো বণ্টন করা হয়েছে। চূড়ান্তভাবে গেজেটভুক্ত হতে যাওয়া এই ৪৯ জনের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বিএনপি জোট। এই জোটের পক্ষ থেকে মনোনীত ৩৬ জন নারী প্রার্থী বিনা বাধায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর পাশাপাশি জামায়াত-এনসিপি এবং ১১ দলীয় জোটের সম্মিলিত আনুপাতিক হারে মনোনীত ১২ জন প্রার্থীও এই তালিকায় নিজেদের স্থান নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক সমর্থন ও কোটায় একজন নারী প্রার্থী বৈধ হিসেবে গেজেটভুক্ত হচ্ছেন। এই রাজনৈতিক বিভাজন ত্রয়োদশ সংসদের মূল রাজনৈতিক শক্তির একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, যেখানে দলগুলোর প্রাপ্ত সাধারণ আসনের ভিত্তিতেই নারীদের এই প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হয়েছে।

তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে বাকি থাকা একটিমাত্র আসন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৯টির গেজেট প্রকাশ করা হলেও একটি আসনের প্রার্থীর বিষয়ে আইনি জটিলতা থাকায় আপাতত সেটির ফলাফল স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে তারা। জানা গেছে, ওই নির্দিষ্ট আসনের প্রার্থিতা নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল এবং মামলাটি এখনো চলমান রয়েছে। উচ্চ আদালত সম্প্রতি এক আদেশে নুসরাত তাবাসসুম নামের এক প্রার্থীর বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্র নতুন করে গ্রহণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের এই নির্দেশনার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে নির্বাচন কমিশন আপাতত ওই একটি আসনের নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছে এবং আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।

আদালতের এই নির্দেশনার পর নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়েও রিটার্নিং কর্মকর্তা সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। তিনি জানান, উচ্চ আদালতের আদেশ হাতে পাওয়ার পর আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই নুসরাত তাবাসসুমের মনোনয়নপত্রটি পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হবে। এই যাচাই প্রক্রিয়ায় যদি তার কাগজপত্র এবং আনুষঙ্গিক তথ্যাদি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তবে তার প্রার্থিতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সাথে বিচার বিভাগের এই ধরনের আইনি ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত জরুরি। যাচাই প্রক্রিয়া শেষে ওই শূন্য থাকা আসনটির বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আপাতত নির্বাচন কমিশন চাইছে, বাকি থাকা ৪৯ জনের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের মূল প্রক্রিয়াটির একটি বড় অংশের সফল সমাপ্তি টানতে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং আইন প্রণয়নে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই স্বাধীনতার পর থেকে সংবিধানে এই বিশেষ ব্যবস্থাটি যুক্ত করা হয়েছিল। প্রথমদিকে এই আসনের সংখ্যা ১৫টি থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে নারীদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সচেতনতা ও দাবির মুখে এই সংখ্যা বাড়িয়ে বর্তমানে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক ভোটের মাধ্যমে এই নারী সদস্যদের নির্বাচিত করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চায় দলগুলো তাদের প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রার্থীকে আগেই মনোনীত করে দেয়, যার ফলে কখনোই আর সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের প্রয়োজন হয় না এবং প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই নির্বাচিত হয়ে আসেন।

সংরক্ষিত নারী আসনের এই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে অবশ্য দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সুশীল সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি গঠনমূলক বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, আনুপাতিক হারে দলীয় মনোনয়নের কারণে যোগ্য নারী নেত্রীদের চেয়ে অনেক সময় দলীয় অনুগতরাই সংসদে যাওয়ার সুযোগ বেশি পান। নারী অধিকার কর্মীদের একটি বড় অংশের দাবি হলো, সংরক্ষিত এই আসনগুলোতেও সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা উচিত। সরাসরি ভোট হলে নারীরা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন এবং রাজনীতিতে তাদের নিজস্ব একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় সরাসরি নির্বাচনী এলাকা না থাকলেও, একজন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য আইন প্রণয়ন, জাতীয় নীতি নির্ধারণ এবং সংসদীয় বিতর্কে সরাসরি নির্বাচিত যেকোনো সংসদ সদস্যের মতোই সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই নতুন ৪৯ জন নারী আইনপ্রণেতার সামনে এখন এক বিশাল দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। জাতীয় সংসদে তারা শুধু নিজেদের দলেরই প্রতিনিধিত্ব করবেন না, বরং দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ কোটি কোটি নারীর অধিকার, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের কণ্ঠস্বর হিসেবে তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং সর্বস্তরে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোতে তাদের জোরালো ও গঠনমূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করে গোটা জাতি। যদিও তাদের কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকা নেই, তারপরও দেশের সার্বিক উন্নয়নে এবং বিশেষ করে নারী সমাজের ভাগ্য পরিবর্তনে তারা নীতিগত পর্যায় থেকে বিশাল অবদান রাখতে সক্ষম।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলেও দেখা যায়, বিশ্বের অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও রাজনৈতিক অঙ্গনে লিঙ্গ সমতা আনার জন্য নানা ধরনের কোটা বা সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে, কারণ আইনসভায় নারীদের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক উপস্থিতি এখানে সাংবিধানিকভাবেই নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে শুধু সংখ্যাগত উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়, গুণগত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই নারীরা কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছেন, সেটাই আগামী দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

পরিশেষে বলা যায়, বৃহস্পতিবারের গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ তার পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। আইনি জটিলতায় আটকে থাকা বাকি একটি আসনের সুরাহা হয়ে গেলে ৫০ জন নারী আইনপ্রণেতার উপস্থিতিতে সংসদের কাঠামো সম্পূর্ণ হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এই নারী সংসদ সদস্যরা যদি দেশ ও জাতির কল্যাণে, বিশেষ করে নারী অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারেন, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে আরও বেশি অর্থবহ এবং সমৃদ্ধ করে তুলবে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের এই ধারা কেবল আইনি একটি প্রক্রিয়া হলেও, সংসদের ভেতরে তাদের কাজ এবং তর্ক-বিতর্ক যেন দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাকে ছুঁতে পারে, সেটাই এখন সবার মূল চাওয়া।


এ জাতীয় আরো খবর...