প্রকৃতির রুদ্ররোষে আবারও বিপর্যস্ত হওয়ার মুখে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে দেশের প্রধান চারটি নদীর পানি ইতিমধ্যেই বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এই বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনা—এই পাঁচ জেলায় আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের গুরুতর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের খামখেয়ালিপনায় যখন বৈশাখের খরতাপে পুড়বার কথা, ঠিক তখনই টানা বৃষ্টির কারণে নদ-নদীর এই রুদ্রমূর্তি জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এই সময়টি বোরো ধান কাটার প্রধান মৌসুম হওয়ায়, এই অকাল বন্যা তাদের সারা বছরের আহার ও বেঁচে থাকার অবলম্বনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ইতিমধ্যে মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনার বেশ কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। নদীর পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এফএফডব্লিউসি-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরে চলমান এই অতিভারী বৃষ্টিপাতই মূলত এই বন্যা পরিস্থিতির প্রধান কারণ। নদীর পানি বৃদ্ধির যে প্রবণতা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, তা মূলত পাহাড়ি ঢল এবং টানা বর্ষণের প্রত্যক্ষ ফলাফল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, এই দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা খুব দ্রুত কেটে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আগামী কয়েক দিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
দেশের বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগজনক। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে, যার পরিমাণ ১৬১ মিলিমিটার। এছাড়া উপকূলীয় জেলা ভোলায় ১৫১ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এই বৃষ্টিপাত একটানা মুষলধারে না হলেও থেমে থেমে বিভিন্ন এলাকায় অব্যাহত থাকবে। আগামী ৪ মে পর্যন্ত সারা দেশে এমন বিরূপ আবহাওয়া স্থায়ী হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। এর আগে গত মঙ্গলবার থেকেই দেশের আটটি বিভাগের বিভিন্ন স্থানে পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টার জন্য ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করেছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর, যার প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান।
নদ-নদীর সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে ভুগাই-কংস, মনু, সোমেশ্বরী ও মগরা—এই চারটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে মনু নদী ছাড়া বাকি তিনটি নদীই নেত্রকোনা জেলার বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে, যার ফলে নেত্রকোনার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়াও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানিও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাত হলে সেই পানি পাহাড়ি ঢল হিসেবে দ্রুত বাংলাদেশের সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরীতে নেমে আসে। পাহাড়ি খরস্রোতা এসব নদীতে পানি বাড়ার হার এতই দ্রুত হয় যে, সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগটুকুও পায় না।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এই ধরনের অসময়ের অতিবৃষ্টি ও অকাল বন্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প তৈরি হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী উজানের এলাকাগুলোতে হঠাৎ অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। এই মুহূর্তে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের বুক ফাটা হাহাকার সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। মাঠে তাদের সোনালি ধান পেকে থাকলেও, বৃষ্টির কারণে তা ঘরে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নদীর পানি আরেকটু বাড়লে তলিয়ে যাবে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে এলে পাহাড়ি নদীগুলোর পানি দ্রুত নেমে যাবে এবং বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। তবে তত দিন পর্যন্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।