দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে যেন মূল্যবৃদ্ধির এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রান্নার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান ভোজ্যতেলের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর থেকে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ে যে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট ও লুকোচুরি চলছিল, তার অবসান ঘটাতে এবার সরকারিভাবেই বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম আগের ১৯৫ টাকা থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে খোলা সয়াবিন তেলের দামও প্রতি লিটারে ৪ টাকা বৃদ্ধি করে ১৭৫ টাকার পরিবর্তে ১৭৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নিত্যপণ্যের এই ঊর্ধ্বমুখী দামে দেশের সীমিত আয়ের ও মধ্যবিত্ত মানুষের পরিবারে যে আরেক দফা অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হলো, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ভোজ্যতেলের এই নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী মিল মালিকদের সংগঠন) সাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ বৈঠক ও দেনদরবারের পর এই নতুন দামের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী ভোজ্যতেলের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করেন। তিনি সাধারণ ভোক্তাদের প্রতি বৈশ্বিক এই সংকটময় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিকভাবে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের দাম এবং পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি করে পরিশোধন করতে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। মিল মালিকরা দীর্ঘদিন ধরেই তেলের দাম অন্তত ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে সরকার এক লাফে এত বেশি দাম বাড়াতে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের দীর্ঘ আলোচনার পর একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর লক্ষ্যে লিটারপ্রতি মাত্র ৪ টাকা বাড়ানোর এই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার নির্ধারিত এই নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর বাজারে মিল মালিক ও ডিলাররা তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করবেন এবং বাজারে এর আগে যে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছিল, তা পুরোপুরি কেটে গিয়ে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক স্বাভাবিক হবে।
তবে সরকারের এই যুক্তির সাথে একমত হতে পারছেন না দেশের সাধারণ ক্রেতা এবং ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন দেশের বাজারে তা লাফিয়ে লাফিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমে, তখন নানা অজুহাতে দেশের বাজারে তা সহজে কমানো হয় না। এছাড়া, মিল মালিকরা বাজারে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে যে ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে দাম বাড়াতে বাধ্য করেন, তা এক ধরনের ‘সফট এক্সটর্শন’ বা পরোক্ষ চাঁদাবাজি বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে বারবার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। এর জন্য দেশের ভেতরে সর্ষে, সূর্যমুখী এবং রাইস ব্র্যানের মতো বিকল্প ভোজ্যতেলের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া, বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বরাবরই শঙ্কা থাকে। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী খোলা তেলে বোতলজাত তেলের লেবেল লাগিয়ে অথবা ওজনে কারচুপি করে সাধারণ ভোক্তাদের ঠকিয়ে থাকেন। তাই নতুন এই মূল্য নির্ধারণের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও বেশি সক্রিয় ও দৃশ্যমান হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৯ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল ১৭৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিতে দেশব্যাপী নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই উৎসব চলতেই থাকবে এবং নিত্যদিনের রান্নার তেলের ঝাঁজ তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।