ক্রিকেট বিশ্বে নিজেদের সক্ষমতা ও আধিপত্য প্রমাণের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) র্যাংকিং। আর এই র্যাংকিংয়ে যদি দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনের অভাবনীয় ছড়াছড়ি থাকে, তবে সেই আনন্দ যে বহুগুণ বেড়ে যায়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠিক এমনই এক আনন্দের জোয়ারে বর্তমানে ভাসছে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট অঙ্গন। ঘরের মাঠে পরাক্রমশালী নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে বীরদর্পে জেতার পর এবার আইসিসির হালনাগাদ র্যাংকিংয়েও বিশাল সুখবর পেলেন বাংলাদেশের একঝাঁক তারকা ক্রিকেটার। আজ বুধবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি তাদের সাপ্তাহিক র্যাংকিং তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে বোলিং, ব্যাটিং এবং অলরাউন্ডার—তিনটি বিভাগেই টাইগারদের অভাবনীয় জয়জয়কার পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটের যে বৈপ্লবিক উত্থান ঘটেছে এবং টপ অর্ডার ব্যাটাররা যেভাবে নিজেদের পুরোনো ছন্দে ফিরে এসেছেন, তার অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে এই নতুন তালিকায়।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ঘরের মাঠে যেকোনো সিরিজের ক্ষেত্রে একসময় স্বাগতিক দলের প্রধান অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো স্পিনারদের। স্পিন নির্ভর সেই চেনা ছক থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ যে এখন পেস বোলিংয়ের মাধ্যমেও বিশ্বের যেকোনো বাঘা বাঘা ব্যাটিং লাইনআপকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই সিরিজটি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। এই সিরিজে স্পিনারদের চেয়ে পেসারদের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। তিন ম্যাচের এই শ্বাসরুদ্ধকর সিরিজে বাংলাদেশের তিন তারকা পেসার—নাহিদ রানা, শরিফুল ইসলাম এবং অভিজ্ঞ মোস্তাফিজুর রহমান—নিজেদের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিয়ে কিউইদের ব্যাটিং লাইনআপকে আক্ষরিক অর্থেই ধসিয়ে দিয়েছেন। এই তিন পেসারের সম্মিলিত শিকার সংখ্যা ১৮টি উইকেট, যা যেকোনো বিচারেই এক অসামান্য পেস বোলিং নৈপুণ্যের পরিচায়ক। আইসিসির নতুন র্যাংকিং মূলত তাদের এই আগ্রাসী ও নিখুঁত বোলিংয়েরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
| একদিনের আন্তর্জাতিক ৩ এর ৩ (BAN ২-১ এ এগিয়ে) | বৃহস্পতি, ২৩-৪ |
| 🇧🇩 BAN | 265/8 (50) |
| 🇳🇿 NZ | 210 (44.5) |
| BAN ৫৫ রানে জিতেছে | |
এই সিরিজের সবচেয়ে বড় চমক এবং প্রাপ্তি ছিলেন নিঃসন্দেহে তরুণ গতি তারকা নাহিদ রানা। নিজের এক্সপ্রেস গতি, ভয়ংকর বাউন্সার এবং নিখুঁত ইয়র্কারের মিশেলে তিনি নিউজিল্যান্ডের ব্যাটারদের রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পুরো সিরিজে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তিন ম্যাচে তিনি একাই শিকার করেছেন ৮টি মহামূল্যবান উইকেট। গতির ঝড় তুলে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার এই অনবদ্য পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি যেমন টুর্নামেন্ট সেরার মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি নিজের ঝুলিতে পুরেছেন, ঠিক তেমনি আইসিসি র্যাংকিংয়েও দিয়েছেন এক অবিশ্বাস্য লাফ। সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে থাকা এই তরুণ তুর্কি এক লাফে ১৬ ধাপ এগিয়েছেন। এই বিশাল উল্লম্ফনের সুবাদে তিনি বর্তমানে ওয়ানডে বোলারদের তালিকায় ৪৮তম স্থানে অবস্থান করছেন। মাত্র কয়েক ম্যাচ খেলেই বিশ্ব ক্রিকেটের সেরা পঞ্চাশ জন বোলারের তালিকায় নিজের নাম লেখানো নাহিদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের আগামীর জন্য এক দারুণ শুভলক্ষণ।
নাহিদ রানার গতির আগুনের পাশাপাশি এই সিরিজে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন প্রতিভাবান বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। নতুন বলে তার সহজাত সুইং এবং পুরোনো বলে দারুণ বৈচিত্র্যময় বোলিং নিউজিল্যান্ডের টপ এবং মিডল অর্ডারকে বারবার ভুল করতে বাধ্য করেছে। তিন ম্যাচের এই সিরিজে শরিফুল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও হিসেবি বোলিং করে মোট ৫টি উইকেট তুলে নিয়েছেন। তার এই ধারাবাহিক ও ইমপ্যাক্টফুল পারফরম্যান্স র্যাংকিংয়ের পাতায় তাকে এনে দিয়েছে দারুণ এক সুখবর। আইসিসির নতুন ওয়ানডে বোলারদের তালিকায় শরিফুল ইসলাম ১১ ধাপ এগিয়েছেন। এই দারুণ লাফের সুবাদে তিনি এখন বিশ্বের সেরা ৩০ জন বোলারের এলিট তালিকায় ঢুকে পড়েছেন, যেখানে তার বর্তমান অবস্থান ২৮তম। পেস বোলিংয়ে বাংলাদেশের নির্ভরতার অন্যতম বড় প্রতীক হয়ে ওঠা শরিফুলের এই অর্জন প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে তিনি দিন দিন নিজেকে একজন পরিণত ও বিশ্বমানের বোলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন।
পেস বোলিংয়ের কথা উঠলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যার নাম সবার আগে সগৌরবে উচ্চারিত হয়, সেই মোস্তাফিজুর রহমানও এই সিরিজে নিজের জাত চিনিয়েছেন প্রবলভাবে। চোট বা টিম ম্যানেজমেন্টের রোটেশন পলিসির কারণে সিরিজের সব ম্যাচে হয়তো তাকে মাঠে দেখা যায়নি, কিন্তু নিজের খেলা একমাত্র ম্যাচটিতেই তিনি ছিলেন রীতিমতো এক ধ্বংসাত্মক শক্তির নাম। নিজের ট্রেডমার্ক কাটার, স্লোয়ার এবং বৈচিত্র্যময় গতির কাছে বিভ্রান্ত করে ওই এক ম্যাচেই তিনি একাই তুলে নেন ৫টি উইকেট। মাত্র এক ম্যাচ খেলেই এমন নজরকাড়া ও বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের কারণে র্যাংকিংয়েও বড় ধরনের পুরস্কার পেয়েছেন ফিজ। বুধবার প্রকাশিত র্যাংকিংয়ে তিনি এক ধাক্কায় ১৪ ধাপ এগিয়ে ৪১তম স্থানে উঠে এসেছেন। মোস্তাফিজের এই চেনা রূপে প্রত্যাবর্তন শুধু তার নিজের আত্মবিশ্বাসই বাড়াবে না, বরং আসন্ন দিনগুলোতে বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোর আগে পুরো বাংলাদেশ দলের পেস আক্রমণের ধার যে কতটা তীক্ষ্ণ, সেই বার্তাই প্রতিপক্ষদের দিয়ে রাখল।
বোলারদের এই অসাধারণ ও আগ্রাসী সাফল্যের পাশাপাশি ব্যাটাররাও কিউইদের বিপক্ষে এই সিরিজে দারুণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষ করে টপ অর্ডারে নাজমুল হোসেন শান্তর পারফরম্যান্স ছিল এককথায় চোখধাঁধানো। সিরিজের তৃতীয় এবং শেষ ম্যাচে চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিনি যে মহাকাব্যিক ও শৈল্পিক ইনিংসটি খেলেছেন, তা দীর্ঘদিন ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। পুরো সিরিজে দুই দলের মধ্যে একমাত্র সেঞ্চুরিয়ান ছিলেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। তার এই অনবদ্য ও ম্যাচজয়ী সেঞ্চুরির সুবাদে বাংলাদেশ শুধু ম্যাচই জেতেনি, নিশ্চিত করেছে স্মরণীয় এক সিরিজ বিজয়ও। শান্তর এমন দুর্দান্ত ব্যাটিং পারফরম্যান্সের কারণে ব্যাটারদের র্যাংকিংয়েও তিনি বড়সড় লাফ দিয়েছেন। ১১ ধাপ এগিয়ে স্টাইলিশ এই ব্যাটার এখন ওয়ানডে ব্যাটারদের র্যাংকিংয়ের ৩২তম স্থানে অত্যন্ত শক্তভাবে অবস্থান করছেন। তার এই ধারাবাহিক ফর্ম এবং দায়িত্বশীলতা বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
শান্তর পাশাপাশি দলের টপ অর্ডারে আরেকজন ব্যাটার, যার ফর্মে ফেরাটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল, তিনি হলেন লিটন দাস। নিজের নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিংয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত লিটন এই সিরিজে নিজের নামের প্রতি পূর্ণ সুবিচার করেছেন। তিন ম্যাচ মিলিয়ে তিনি মোট ১২৯ রান সংগ্রহ করেছেন, যার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দারুণ হাফ সেঞ্চুরির ইনিংসও রয়েছে। ওপেনিংয়ে নেমে তার দেওয়া দারুণ শুরুর ওপর দাঁড়িয়েই মূলত বাংলাদেশ বড় স্কোরের ভিত্তি গড়েছে। এই সিরিজে তার এমন সাবলীল ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের কারণে আইসিসি র্যাংকিংয়েও বড় ধরনের প্রমোশন পেয়েছেন তিনি। এক লাফে ১৫ ধাপ এগিয়ে লিটন দাস এখন বিশ্বসেরা ব্যাটারদের তালিকায় ৬৫তম স্থানে উঠে এসেছেন। লিটনের ব্যাটে এই আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়াটা বাংলাদেশ দলের থিংক ট্যাংকের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় পাওয়া, যা আগামী সিরিজগুলোতে দলের ভিত আরও মজবুত করবে।
ব্যাটিং এবং বোলিং—উভয় বিভাগেই সমান তালে দলের হয়ে অবদান রাখা অলরাউন্ডারদের র্যাংকিংয়েও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বরাবরের মতোই জ্বলজ্বল করছে। দলের অন্যতম ভরসা ও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ অলরাউন্ডারদের এই শীর্ষ তালিকায় নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করেছেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে তিনি ব্যাটে-বলে নিজের অপরিহার্যতা আবারও প্রমাণ করেছেন। যদিও পরিসংখ্যানের পাতায় তিন ম্যাচে ৩৬ রান এবং ২ উইকেট হয়তো খুব একটা বিশাল কিছু মনে নাও হতে পারে, কিন্তু ম্যাচের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাপের মুহূর্তে তার এই ছোট ছোট অথচ কার্যকরী অবদানগুলো দলের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অলরাউন্ডার র্যাংকিংয়ে তিনি যৌথভাবে বিশ্বের তৃতীয় সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে উঠে এসেছেন। তার বর্তমান রেটিং পয়েন্ট ২৭৫, যা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞ তারকা মোহাম্মদ নবীর একেবারে সমান। এই মুহূর্তে অলরাউন্ডারদের এই শীর্ষ তালিকায় প্রথম দুটি স্থান নিজেদের দখলে রেখেছেন যথাক্রমে আফগানিস্তানের আজমতউল্লাহ ওমরজাই (৩২৯ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে) এবং জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা (২৭৬ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে)। মিরাজের এই শীর্ষ তিনে অবস্থান এই বার্তাই দেয় যে, তিনি বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ও নির্ভরযোগ্য ম্যাচ উইনার।
পরিশেষে বলা যায়, ব্ল্যাকক্যাপসদের বিপক্ষে এই হোম সিরিজটি বাংলাদেশের জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক অবিস্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক সাফল্য বয়ে এনেছে। একসময় নিজেদের মাটিতে স্পিন-নির্ভর দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন নিজেদের দুর্ধর্ষ পেস আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শিখেছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের ভাবমূর্তিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আইসিসির এই সর্বশেষ র্যাংকিং আপডেটটি শুধু কিছু সংখ্যার রদবদল নয়; এটি মূলত খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং মাঠে নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দেওয়ার এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই র্যাংকিং উন্নতির ফলে দলের সামগ্রিক আত্মবিশ্বাস যেমন বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, তেমনি তরুণ ক্রিকেটাররাও আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও ভালো করার জন্য তীব্র অনুপ্রেরণা পাবে। সামনে থাকা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোতে বাংলাদেশ দল এই অটুট আত্মবিশ্বাস ও দলীয় একতাকে পুঁজি করে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে, এমনই প্রত্যাশা এখন কোটি কোটি ক্রিকেটভক্তের।