বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৮ অপরাহ্ন

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে প্রকৃতি: লেবাননে ইসরায়েলের ‘ইকোসাইড’

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর যুদ্ধের খবরের আড়ালে নীরবে ঘটে চলেছে আরেক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। বোমা আর বারুদের আঘাতে কেবল মানুষের জীবন বা দালানকোঠাই গুঁড়িয়ে যাচ্ছে না, চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশ। লেবাননের ক্ষেত্রে এই বিপর্যয়ের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সরাসরি ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশগত গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৩ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দক্ষিণ লেবানন ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন হামলার কারণে প্রকৃতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির অস্তিত্বের জন্যই বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবাননের মাটি, পানি, বাতাস এবং সবুজ অরণ্য আজ যুদ্ধের বিষাক্ত থাবায় বিপন্ন।

লেবাননের বৈজ্ঞানিক গবেষণাবিষয়ক জাতীয় কাউন্সিল বা সিএনআরএস-এল সম্প্রতি এই পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের ওপর একটি অত্যন্ত বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ১০৬ পৃষ্ঠার এই বিশাল নথিতে উঠে এসেছে কীভাবে একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে সুপরিকল্পিতভাবে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর উপর্যুপরি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ এবং অন্যান্য সামরিক কার্যক্রমে লেবাননের অন্তত পাঁচ হাজার হেক্টর বা প্রায় সাড়ে বারো হাজার একর বনভূমি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। লেবাননের ঐতিহ্যবাহী চওড়া পাতার গাছ, পাইন বন এবং স্টোন পাইনের মতো অমূল্য বৃক্ষসম্পদ আজ আগুনে পুড়ে ছাই। এই বনভূমিগুলো শুধু গাছপালার সমাহার ছিল না, বরং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ছিল। বনভূমি উজাড় হওয়ার ফলে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনচক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাপক ভূমিক্ষয়। গাছপালার অভাবে মাটির স্বাভাবিক গঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় স্থানীয় জলবায়ুতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

বনভূমির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে লেবাননের কৃষিখাতে। দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকা মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা, যেখানে যুগ যুগ ধরে সাধারণ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই কৃষিব্যবস্থা আজ পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও লেবাননের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ফসলের মাঠ, গবাদিপশুর খামার, বনজ সম্পদ, মৎস্য খামার এবং জলজ চাষের অবকাঠামোসহ প্রায় ১১৮ মিলিয়ন ডলারের ভৌত কৃষিসম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে। কৃষকরা তাদের জমিতে যেতে পারছেন না, ফসল কাটার মৌসুম ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদনের হার তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর ফলে শুধু কৃষি উৎপাদনেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৮৬ মিলিয়ন ডলারে। লেবাননের ঐতিহ্যবাহী জলপাই বাগানগুলোর ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হানা হয়েছে। শতাব্দী প্রাচীন প্রায় ৪৭ হাজার জলপাই গাছ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ৮১৪ হেক্টর জলপাই বাগান, ৬৩৭ হেক্টর লেবুজাতীয় ফলের বাগানসহ মোট দুই হাজার ১৫৪ হেক্টর ফলের বাগান এবং মাইলের পর মাইল বিস্তৃত কলাবাগান সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি হলো মাটির বিষাক্তকরণ এবং রাসায়নিক দূষণ। ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যবহৃত বিভিন্ন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, বিশেষ করে হোয়াইট ফসফরাস বা সাদা ফসফরাস বোমার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে লেবাননের মাটি তার উর্বরতা হারাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে মাটিতে ফসফরাসের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে ৯০০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা প্রতি মিলিয়নে ১ হাজার ৮৫৮ পার্টস বা পিপিএম পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই উচ্চমাত্রার ফসফরাস এবং ভারী ধাতু—যেমন সীসা, দস্তা, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়াম—মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানিকেও দূষিত করছে। পাশাপাশি, কৃষি জমিতে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার গ্লাইফোসেট জাতীয় আগাছানাশক ছিটানোর অভিযোগও উঠেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ক্যানসারের মতো মারণব্যাধির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই বিষাক্ত রাসায়নিক মাটি ও পানিতে মিশে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে, যার ফলে ওই অঞ্চলের উৎপাদিত ফসলের ওপর মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

মাটি ও পানির পাশাপাশি লেবাননের আকাশও আজ চরম দূষণের শিকার। বোমা বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ডের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকায় যে বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়ছে, তা শুধু হামলার নির্দিষ্ট জায়গাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাতাসের মাধ্যমে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম কণা, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক গ্যাস এবং ডাই-অক্সিন ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত যৌগের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি। এসব বিষাক্ত গ্যাস শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ এবং অন্যান্য জটিল শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং গর্ভবতী নারীরা এই বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ইসরায়েল বর্তমানে লেবাননে যে কৌশল অবলম্বন করছে, তা মূলত ফিলিস্তিনের গাজায় ব্যবহৃত ‘গাজা কৌশল’-এরই একটি সুস্পষ্ট পুনরাবৃত্তি। গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানকার প্রায় অর্ধেক বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি এবং কৃষিজমি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে দক্ষিণ লেবাননেও সুপরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে তাদের ভিটেমাটি থেকে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে। হাসপাতাল, চিকিৎসাকর্মী এবং ত্রাণকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে, গ্রামের পর গ্রাম বুলডোজার ও ভারী অস্ত্র দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান নিয়ামক পানি সরবরাহের অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক মাসে লেবাননের অন্তত ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ পানির নেটওয়ার্ক এবং অসংখ্য পানি শোধনাগার বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন। এমনকি সত্য প্রকাশের দায়ে সংবাদকর্মীদেরও হত্যার শিকার হতে হচ্ছে, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল।

এই সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞের কারণে লেবাননের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা কল্পনাতীত। একটি স্বাধীন প্রতিবেদন ও সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে লেবাননের সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে শুধু ভৌত অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণই ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশটিকে টেনে তুলে পুনরায় বাসযোগ্য করতে, পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে প্রয়োজন হবে অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার। আগে থেকেই চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত লেবাননের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতি একা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।

লেবাননের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বারবার এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন যে, পরিবেশের এই অপূরণীয় ক্ষতি শুধু গাছপালা বা মাটির ক্ষতি নয়; এটি সরাসরি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে যুক্ত। ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষিজমি ও বিষাক্ত মাটির কারণে দেশটির ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। হাজার হাজার কৃষক ও খামারি তাদের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন, যা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও দারিদ্র্য ডেকে আনবে। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতার বিকল্প নেই। পরিবেশ পুনরুদ্ধারের এই দীর্ঘ এবং জটিল প্রক্রিয়ায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে লেবাননের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং একটি টেকসই অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।

অন্যদিকে, পরিবেশ ধ্বংসের এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, তারা তাদের অভিযানের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে অবগত। তবে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাদের দাবি, বেসামরিক মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য তারা প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেই সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু লেবাননের বিস্তীর্ণ পোড়া প্রান্তর, বিষাক্ত জলাশয় এবং বিপন্ন জনপদের চিত্র ইসরায়েলি বাহিনীর এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত এক নিষ্ঠুর সত্যকেই বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। যুদ্ধ শেষ হলেও বারুদ আর বিষের যে ক্ষত লেবাননের প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে খোদাই হয়ে যাচ্ছে, তা হয়তো কয়েক প্রজন্ম ধরে তাদের বয়ে বেড়াতে হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...