মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট বর্তমানে এক চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবং অন্যদিকে কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি অবরোধ পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। ঠিক এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতির মাঝেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আগামী মাস থেকে বৈশ্বিক তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ‘ওপেক’ (OPEC) থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপসাগরীয় এই দেশটি। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের এক সুদূরপ্রসারী কৌশল। এই পদক্ষেপকে যেমন একদিকে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র নেতৃত্বের প্রতি আমিরাতের সরাসরি এবং প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন জয় করার জন্য একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক চাল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান এই ভয়াবহ সংঘাত হয়তো উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একধরনের আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের এই ডামাডোল দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিভাজন এবং ভ্রাতৃঘাতী কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র ও সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ছাড়ার এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের গভীরভাবে তাকাতে হবে তেল উৎপাদনের বৈশ্বিক কোটা ও দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির দিকে। দীর্ঘদিন ধরেই ওপেক জোটের ভেতরে সৌদি আরব এবং আমিরাতের মধ্যে তেল উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে একধরনের স্নায়ুযুদ্ধ বা শীতল লড়াই চলছিল। ওপেকের অঘোষিত নেতা হিসেবে সৌদি আরবের মূল লক্ষ্যই ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কিছুটা দমিয়ে রেখে দাম স্থিতিশীল ও চড়া রাখা। কিন্তু আমিরাতের জাতীয় নীতি ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা সবসময়ই চেয়েছিল নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি করতে এবং বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ঘরে তুলতে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাত সবসময়ই উৎপাদনের পরিধি বাড়ানোর কৌশলের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, আর সৌদি আরবের নীতি ছিল যেকোনো মূল্যে দাম নিয়ন্ত্রণের। এই নীতিগত পার্থক্যের পেছনে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও জনতাত্ত্বিক কাঠামো একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস, তাই বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, রাষ্ট্রের বিপুল ব্যয় মেটাতে এবং অর্থনীতি সচল রাখতে তাদের তেলের মজুত বেশি হলেও উচ্চমূল্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা মাত্র দশ লাখের কাছাকাছি (বাকিরা প্রবাসী কর্মী)। ফলে তেল থেকে প্রাপ্ত জাতীয় আয়ের ভাগাভাগি সেখানে তুলনামূলকভাবে অনেক কম মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা তাদের দামের চেয়ে পরিমাণের দিকে বেশি নজর দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
আমিরাতের এই বিশাল উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে রয়েছে তাদের বিপুল অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ রূপকল্প। গত কয়েক বছরে আমিরাত তাদের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামো এবং তেল উত্তোলন সক্ষমতা আধুনিকীকরণ করতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিদিন অন্তত ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করা। কিন্তু ওপেকের কঠোর নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকায় তারা তাদের প্রকৃত সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম তেল উৎপাদন করতে বাধ্য হচ্ছিল। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ওপেকের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উৎপাদনের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অব্যবহৃত বা অলস সক্ষমতা রয়েছে আমিরাতের হাতেই। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমিরাতের এই জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। কারণ বিশ্বজুড়ে যেভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তাতে মাটির নিচে থাকা জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য আগামী দশকগুলোতে এখনকার মতো চড়া না-ও থাকতে পারে। তাই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য অপেক্ষা না করে, এখনই সর্বোচ্চ পরিমাণ তেল উত্তোলন করে তা দ্রুত বিক্রি করার কৌশল নিয়েছে আবুধাবি। এই অর্থ দিয়ে তারা তাদের অর্থনীতিকে তেল-নির্ভরতা থেকে বের করে এনে প্রযুক্তি ও পর্যটনের একটি বৈশ্বিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
তবে কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ দিয়ে আমিরাতের এই অভাবনীয় সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক এবং অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের মতো স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের এই যুদ্ধের আগে থেকেই সৌদি আরব ধীরে ধীরে আমিরাতের অবস্থানের দিকে এগোচ্ছিল। রিয়াদও একসময় বুঝতে পেরেছিল যে শুধু দাম বাড়িয়ে বসে থাকলে চলবে না, বিশ্ববাজারে নিজেদের অংশীদারিত্বও বাড়াতে হবে। তাই অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব যখন কিছুটা প্রশমিত হওয়ার পথে, ঠিক তখনই আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তটি পরিষ্কার প্রমাণ করে যে এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। অনেকের মতেই, এটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে আমিরাতের কোনো গোপন নিরাপত্তা সমঝোতারই চূড়ান্ত ফসল। ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা পাওয়ার বিনিময়ে আমিরাত হয়তো ওপেককে দুর্বল করে দেওয়ার এই পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
আমিরাতের এই জোটত্যাগের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে যখন তারা প্রকাশ্যে এবং গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রবলভাবে উৎসাহ দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইসরায়েলের সাথে তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরের পর থেকেই এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ হচ্ছিল, আর বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তা এক নতুন ও অভাবনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বেশ কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ইরানের সম্ভাব্য মিসাইল ও ড্রোন হামলার হাত থেকে আমিরাতের আকাশসীমাকে সুরক্ষা দিতে ইসরায়েল সেখানে তাদের অত্যন্ত আধুনিক ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যন্ত মোতায়েন করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বর্তমানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং এই দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অঞ্চলে যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে অনেক দেশই যখন সামরিক স্থাপনা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের ওপর সরাসরি হামলা না চালানোর জন্য ওয়াশিংটনকে অনুরোধ করেছিল, তখন আমিরাত ঠিক এর উল্টো পথে হেঁটেছে। তারা যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার উদ্যোগগুলোকে ভেতর থেকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে কূটনীতিকরা মনে করেন।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে সৌদি আরব ও আমিরাতের এই দ্বিমুখী অবস্থান এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। যুদ্ধের এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও সৌদি আরব যখন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি প্রতিবেশী পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের সাথে কূটনৈতিক সমাধানের একটি সম্মানজনক পথ খোলা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, তখন আমিরাত চাইছে এই যুদ্ধের ডামাডোলকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে। ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তটিকে তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমিরাতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও নিবিড় ও কৌশলগত করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ওপেককে বিশ্বের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী এবং তেলের দাম বাড়িয়ে ‘বিশ্বকে ঠকানো’ একটি জোট হিসেবে কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। ওপেকের মতো একটি প্রভাবশালী কার্টেলকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়ে আমিরাত মূলত ট্রাম্পের মন জয় করার এক চূড়ান্ত প্রয়াস চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের প্রবল ধারণা, ওপেকের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরপরই আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও বৃহৎ আকারের দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ঘোষণা আসতে পারে। ইতিমধ্যেই আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইরানের সাথে এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ীও হয়, তবু আবুধাবি তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশ অভূতপূর্বভাবে কাছাকাছি আসছে। বিশ্ববাজারে ডলারের তীব্র সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সরাসরি ‘কারেন্সি সোয়াপ’ বা মুদ্রা বিনিময় চুক্তির প্রস্তাবও দিয়েছেন আমিরাতের নীতিনির্ধারকেরা। এর ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও আস্থা আরও বহুগুণে বাড়বে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরবের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং নেতৃত্বের অহংকার চূর্ণ করার একটি প্রচ্ছন্ন বার্তাও ছুঁড়ে দিচ্ছে আমিরাত। ওপেক এবং ওপেক প্লাস জোটে সৌদি আরবের যে নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব ও প্রভাব রয়েছে, আমিরাতের মতো তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক দেশের এমন আকস্মিক প্রস্থান তাতে এক বিশাল ও অকল্পনীয় ধাক্কা দেবে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, আমিরাতের এই একরোখা সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সৌদি রাজপরিবারকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করবে। কারণ এর মাধ্যমে আমিরাত পুরো বিশ্বকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, রিয়াদের রাজনৈতিক ছায়াতলে থাকার দিন তাদের ফুরিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের নিজস্ব বড় কোনো বৈশ্বিক পরিকল্পনা রয়েছে। রিয়াদ ও আবুধাবির এই ক্ষমতার লড়াই কেবল তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে ইয়েমেন, সুদান এবং লিবিয়ার মতো দেশগুলোর রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধেও। এই প্রতিটি রণাঙ্গনেই দুই দেশ বিপরীত পক্ষকে বিপুল অর্থ ও আধুনিক অস্ত্র দিয়ে মদদ যোগাচ্ছে। বিশেষ করে লিবিয়াতে আমিরাতের প্রভাব খর্ব করতে সৌদি আরবের অস্ত্র পাঠানোর গোপন খবর ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে তাদের মধ্যকার ফাটল কতটা গভীর।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ তেল এশিয়া ও ইউরোপে পরিবাহিত হতো, তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। সংঘাত শুরুর আগে আমিরাত প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। এখন সেই পরিমাণ কমে প্রায় ১৯ লাখ ব্যারেলে নেমে এলেও, আমিরাতের হাতে এমন একটি বিশাল কৌশলগত সুবিধা রয়েছে যা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের নেই। সেটি হলো তাদের ‘হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন’ (ADCOP)। অত্যন্ত দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি করা এই পাইপলাইনের মাধ্যমে আমিরাত এখন পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির বিপদসংকুল পথ পুরোপুরি এড়িয়ে সরাসরি ওমান উপসাগরে অবস্থিত ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করতে পারছে। আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রীর মতে, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই ওপেক ছাড়ার জন্য এই সময়টি তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি নিখুঁত মনে হয়েছে। কারণ বিশ্ববাজারে এখন এমনিতেই তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তাই আমিরাত ওপেক ছাড়লেও উৎপাদক দেশগুলোর ওপর তার তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম পড়বে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত জ্বালানি ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষকরা মনে করেন, আমিরাতের বর্তমান জ্বালানি নীতি এখন সৌদি আরবের চিরাচরিত নীতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মেরুতে অবস্থান করছে। ওপেক ছাড়ার ফলে আমিরাতকে আর সৌদি আরবের চাপিয়ে দেওয়া কোনো শর্ত বা উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা মানতে হবে না, যা বিশ্ববাজারে তাদের অবস্থানকে আরও স্বাধীন, নমনীয় ও শক্তিশালী করবে। দীর্ঘমেয়াদে বিচার করলে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ৬৫ বছর পুরোনো ওপেক জোটের জন্য এক ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে। ২০১৯ সালে কাতার এবং ২০২৩ সালে অ্যাঙ্গোলার ওপেক ছাড়ার পর আমিরাতের মতো একটি জ্বালানি পরাশক্তির প্রস্থান এই কার্টেলের মূল ভিত্তিকে আক্ষরিক অর্থেই নড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন বিশ্ববাজারে তেলের তীব্র ঘাটতি তৈরি হবে, তখন আমিরাত তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে এই বিপুল বাড়তি উৎপাদন দিয়ে ভারত বা চীনের মতো বড় বাজারগুলো দখল করবে, যা ওপেকের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে চিরতরে অকার্যকর করে দিতে পারে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই বিশ্ববাসী তেল কূটনীতির এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে একসময়ের পরাক্রমশালী ওপেকের চূড়ান্ত অবসানের সূচনালগ্নটি দেখতে যাচ্ছে।