সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

মাসোহারার বিনিময়ে চলছে অবৈধ ক্লিনিক, নীরব স্বাস্থ্য প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক। তবে চিকিৎসার এই বাণিজ্যিক প্রসারের সমান্তরালে চরমভাবে ভেঙে পড়েছে সরকারি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং এর অধীনস্থ স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের চরম জনবল সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং বা নজরদারি করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী চিকিৎসাসেবার নামে দেশব্যাপী এক ভয়ংকর ‘গলাকাটা’ বাণিজ্য শুরু করেছে। বেশিরভাগ বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রই সরকারি নিয়মনীতি বা কোনো ধরনের আইনি তোয়াক্কা না করে পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো ও ভবন নির্মাণেও ন্যূনতম কোড মানা হচ্ছে না। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অনিয়ম ও অবৈধ ব্যবসা দিনের পর দিন বুক ফুলিয়ে চলার পেছনে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের এক গভীর দুর্নীতি। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত তদারকি না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের একশ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারী এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা মাসোহারা নিচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভুল চিকিৎসা ও প্রতারণার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন।

চিকিৎসা খাতের এই চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায়ই হাসপাতালের বদ্ধ কক্ষে কিংবা অপারেশন থিয়েটারে অনভিজ্ঞতার বলি হয়ে সাধারণ রোগীর মৃত্যু ঘটছে। সিজারিয়ান অপারেশন করতে গিয়ে মা ও নবজাতকের করুণ মৃত্যু, কিংবা সাধারণ সার্জারির নামে অঙ্গহানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুল চিকিৎসার কারণে পঙ্গুত্ব বরণ করে বহু মানুষ তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, যার ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালে গত ২৭ মে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও পরিকাঠামোগত ত্রুটির কারণে একসাথে ছয়টি নবজাতকের করুণ মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট জানান যে, আদ-দ্বীন হাসপাতালের ভবনের কাঠামোগত ত্রুটি, ডিউটিতে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেনের তীব্র সংকটই এই ছয়টি নিষ্পাপ শিশুর অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী। তদন্তে উঠে এসেছে যে, খোদ রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই বিশাল ভবনটি একটি মানসম্মত চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মোটেও উপযোগী ছিল না।

অনুরূপভাবে, রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে স্রেফ খতনা করাতে গিয়ে ছয় বছরের শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনাটি দেশের সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই নির্মম ঘটনাটি পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়, যেখানে আদালত ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের অনুমোদিত ও অননুমোদিত সমস্ত বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তলব করেন। ঢাকার এভারকেয়ার, মিটফোর্ড, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় চক্ষু হাসপাতালের মতো বড় বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর চারপাশে এখন এক শক্তিশালী দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে আসাদগেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় পাঁচ শতাধিক সরকারি-বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, যারা এই দালালদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরকারি হাসপাতালে আসা দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের ভুল বুঝিয়ে, ভয় দেখিয়ে কিংবা উন্নত চিকিৎসার লোভ দেখিয়ে এসব দালালরা পাশের বেসরকারি নোংরা ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। একাধিক দালালের স্বীকারোক্তি থেকে জানা গেছে, এই জঘন্য বাণিজ্যের টাকা কেবল তারা একাই পায় না, বরং সরকারি হাসপাতালের একশ্রেণীর ওয়ার্ড মাস্টার ও কর্মচারীও এই চুরির ভাগ পেয়ে থাকেন।

বেসরকারি ল্যাব বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ব্যবসার ধরন আরও বেশি ভীতিপ্রদ। কোনো কোনো নামী চিকিৎসক রোগীদের অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে থাকেন, কারণ এসব পরীক্ষা থেকে তারা সরাসরি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ কমিশন পান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকেরা চিকিৎসকদের খুশি রাখতে তাদের বিদেশ ভ্রমণের সম্পূর্ণ খরচ পর্যন্ত বহন করেন। সাধারণ ছোট-বড় প্রায় সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই এই অনৈতিক কমিশন বাণিজ্য চালু রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে এখন নামমাত্র ‘আইসিইউ’ বা নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র খুলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্যবসা চলছে। অনেক সময় রোগীর অপারেশনের বা সিজারের কোনো প্রয়োজন না থাকলেও জোর করে তাদের টেবিলে তোলা হয়। পরবর্তীতে অবস্থা বেগতিক হলে কিংবা নিজেদের ভুল ঢাকতে রোগীকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াই কেবল কৃত্রিম অক্সিজেন সিলিন্ডার ও নাকে পাইপ লাগিয়ে রেখে দিনের পর দিন বিল বাড়ানো হয়, যা রোগীর স্বজনদের পকেট কাটার এক নিষ্ঠুর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের এই অরাজকতার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রশাসনের কাঠামোগত স্থবিরতাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এই সংকটের সত্যতা স্বীকার করে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি জানান, যখন এ দেশে প্রথম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠন করা হয়েছিল, তখন পুরো দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছিল মাত্র আটটি। জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংখ্যাও ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং বেসরকারি খাতের ক্লিনিক ছিল হাতেগোনা কয়েকটি। তখন সিভিল সার্জন ও স্থানীয় কর্মকর্তারা সহজেই সবকিছু মনিটর করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৫টিতে এবং বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল নেটওয়ার্ক তদারকি করার জন্য যে পরিমাণ জনবল ও আধুনিক লজিস্টিকস প্রয়োজন, তা বর্তমান স্বাস্থ্য প্রশাসনের নেই। কর্মকর্তাদের মতে, এই বিশাল মহাসমুদ্রে বর্তমান জনবল স্রেফ এক ফোঁটা পানির মতো।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নীতিনির্ধারক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কারের কথা বলছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সুমন নাজমুল বলেন, বর্তমান যুগের চাহিদা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিধি ও জনবল অবিলম্বে বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এই বিশাল বেসরকারি খাতকে নিয়মের মধ্যে আনা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাবেক পরিচালক ডা. বেনজীর আহমেদ এক যুগান্তকারী পরামর্শ দিয়ে বলেন, শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্যই এখন আলাদা প্রশাসন বা উইং প্রয়োজন। দেশব্যাপী চিকিৎসাসেবার মান রক্ষা করতে হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাধারণ প্রশাসনিক শাখা থেকে ‘হাসপাতাল বিভাগ’কে সম্পূর্ণ আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী ‘হাসপাতাল অধিদপ্তর’ গঠন করা সময়ের দাবি। যতক্ষণ না পর্যন্ত স্বাধীন তদারকি সংস্থা গঠন এবং প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এই মরণখেলা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।

তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক


এ জাতীয় আরো খবর...