বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে মাঠপর্যায়ে এক দল থেকে অন্য দলে ভেড়ার সুবিধাবাদী সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। তবে সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার পর এই প্রবণতা নতুন করে তীব্র রূপ ধারণ করেছে, যা খোদ প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে। বিগত ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর, ৮ই আগস্টেই বিএনপির দলীয় হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল—কোনো অবস্থাতেই নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের বিতর্কিত নেতাকর্মীদের বিএনপিতে নেওয়া যাবে না। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এই আদেশটি পরবর্তীতে চলতি ২০২৬ সালের ৯ই জানুয়ারি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়ে তা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্র থেকে বারবার কড়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সত্ত্বেও এক বছর না যেতেই তৃণমূলের একটি বড় অংশে তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৩রা জুন খোদ গোপালগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের হাত ধরে ওই অঞ্চলের এক বিশাল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি গাজীপুরের টঙ্গীতে জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের অংশ) থানা সভাপতি সাইফুল ইসলাম খান, সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক এবং সহ-সভাপতি সালাউদ্দিন মজিবুর রহমানসহ শতাধিক নেতাকর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। আদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন পটভূমির এসব সুবিধাবাদী লোকজনকে দলে ভেড়ানোর কারণে বিএনপির ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি বড় অংশ মনে করছে, এভাবে বাছবিচার ছাড়া অন্য দলের লোকজনকে দলে নিলে দীর্ঘমেয়াদে দলের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হবে এবং বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকট তৈরি হতে পারে।
নতুন সরকার গঠনের পর গত ১০-১১ মাস ধরে দেশের রাজনীতিতে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় প্রভাব পড়েছে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে। দলটির অনেক শীর্ষ ও কর্মীবান্ধব সাংগঠনিক নেতা বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। যেমন—দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সামলাচ্ছেন এলজিআরডি (স্থানীয় সরকার) মন্ত্রণালয়। একইভাবে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই নিবেদিতপ্রাণ ও শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রীয় ও সরকারি কাজে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকায় আগের মতো দলকে পুরোপুরি সময় দিতে পারছেন না, যার ফলে কেন্দ্রের সাথে তৃণমূলের এক ধরনের সাংগঠনিক দূরত্ব ও ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তৃণমূলের কর্মীরা সরাসরি তাঁদের প্রিয় নেতাদের আগের মতো পাশে না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প ও দক্ষ নেতৃত্বের সংকটও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের এই শিথিলতার সুযোগে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মতপার্থক্য ও গ্রুপভিত্তিক কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু রক্তক্ষয়ী ঘটনা এর সত্যতা প্রমাণ করে। গত ৪ঠা জুন ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বিএনপির দুটি বিবদমান গ্রুপের মধ্যে এক ভয়াবহ ও হিংসাত্মক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যার জেরে পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কেবল ঝিনাইদহ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে হবিগঞ্জের মাধবপুর, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ এবং পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নিজস্ব দুই গ্রুপের মধ্যে একাধিক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে দলের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি ত্যাগী নেতারা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যেখানে একটি কঠোর, নিয়ন্ত্রিত এবং সুশৃঙ্খল দলীয় সম্প্রসারণ চাচ্ছে; সেখানে তৃণমূলের একটি অংশ নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে বাস্তব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে কেন্দ্রের নির্দেশনার সাথে তৃণমূলের এই বৈপরীত্য আগামী দিনে দলটির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। অন্য দলের বিতর্কিত নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্তি বন্ধ করা, বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নতুন কমিটি গঠন এবং নেতৃত্বের সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখা—এই তিনটি প্রধান বিষয়ই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বিএনপির কেন্দ্র ও তৃণমূলের সম্পর্ক কতটা মজবুত থাকবে। বর্তমানে দলে যে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, তা যদি দ্রুত কঠোর হাতে দমন করা না যায়, তবে তা দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে ফেলে দেবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ