সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

পার্লামেন্টে চুপ, রাস্তায় বুলডোজার! নেপালে একি হচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

‘মা নেপালো হাসেকো হেরনো চাহাচ্ছু’—অর্থাৎ ‘আমি দেখতে চাই নেপাল হেসে উঠুক’। নিজেরই সুপারহিট র‍্যাপ গানের এই জনপ্রিয় লাইন গেয়ে নেপালের লাখো তরুণকে রাজপথে নামিয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সী বালেন শাহ। বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় এক বছর পর, নেপালের ‘জেন-জি’ (Gen-Z) বা তরুণ প্রজন্মের এই তুমুল জনপ্রিয় পপ-কালচার আইকন বসেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই মাস অর্থাৎ ৫০ থেকে ৬০ দিনের মাথায় নেপালের সেই চেনা হাসিমুখ উধাও। যে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তরুণদের উন্মাদনা আকাশ ছুঁয়েছিল, আজ তাঁরই বিরুদ্ধে কাঠমান্ডুর দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান উঠছে। ‘জেন-জি’ প্রধানমন্ত্রী কি তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছেন? বাংলাদেশের মিডিয়া যখন নেপালের এই নতুন সরকারকে নিয়ে এক ধরনের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বা মধুচন্দ্রিমা উদযাপনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কাঠমান্ডুর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো এবং রহস্যময়।

পার্লামেন্টে একনায়কতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থা কবজাকরণ

দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সাত সপ্তাহের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর সংসদীয় আচরণের গণতান্ত্রিক রূপ নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের বাজেট অধিবেশনের ভাষণের মাঝপথেই হঠাৎ আসন ছেড়ে উঠে চলে যান প্রধানমন্ত্রী বালেন। শুধু তাই নয়, পার্লামেন্টের নিয়মিত প্রশ্নোত্তর পর্বেও তিনি অংশ নিতে সম্পূর্ণ রাজি নন; নিজের জবাবদিহিতার অংশটুকু তিনি ছেড়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রীর ঘাড়ে। অন্যদিকে নিজের একক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়াতে তিনি এক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (PMO) অধীন করে নিয়েছেন তিনি। সমালোচকরা বলছেন, মুখে পরিবর্তনের কথা বললেও বালেন শাহ আসলে নেপালের ক্ষমতা কাঠামোকে একচ্ছত্র ও একনায়কতান্ত্রিক করার দিকেই হাঁটছেন।

পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি উচ্ছেদ ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সংঘাত

তবে বালেন শাহ সরকারের সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গাটি তৈরি হয়েছে কাঠমান্ডুর রাজপথে। শহুরে সৌন্দর্য বাড়ানোর নামে কোনো ধরনের পূর্ব-পুনর্বাসন ছাড়াই গরীব, ভূমিহীন আর ভাসমান মানুষের বস্তিগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে তাঁর প্রশাসন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওক্সফ্যামের (Oxfam) রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপালের ওপরের মাত্র ১% মানুষের হাতে রয়েছে দেশের মোট ২৫% সম্পদ, আর নিচের ৫০% মানুষের হাতে মাত্র ১০%। এমন চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের দেশে এই অমানবিক উচ্ছেদ নীতি নিচু তলার মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে, যার ফলে রাজধানী জুড়ে প্রতিদিন চলছে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর।

এর মাঝেই ‘জেন-জি’ সরকার সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগের সাথে। জ্যেষ্ঠতার দীর্ঘদিনের প্রথা ও নিয়ম ভেঙে তিন-তিনজন সিনিয়র বিচারপতিকে ডিঙিয়ে বালেন শাহ প্রধান বিচারপতি পদে বসিয়েছেন নিজের অনুগত মনোজ কুমার শর্মাকে। পার্লামেন্টে তাঁর দলের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ থাকায় এই স্বেচ্ছাচারিতা সম্ভব হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে তিনি ছাত্র রাজনীতি এবং সরকারি চাকরিতে ট্রেড ইউনিয়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু বড় ধাক্কাটি এসেছে যখন ভারত সীমান্তবর্তী মধেসি অঞ্চলের সাধারণ জিনিসপত্রের ওপর ৫% থেকে ৮০% পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক বসানোর সরকারি সিদ্ধান্ত দেশের আদালত আটকে দেয়। এই করারোপের কারণে সীমান্ত এলাকার মধেসি জনগোষ্ঠী সরকারের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। তরুণেরা এখন শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, জোয়ারের ভোটে জেতার পর দুই মাসেই কি তবে বালেনের জনপ্রিয়তায় ভাটা শুরু হলো?

ভূ-রাজনীতির বিপজ্জনক খেলা ও ভূটানি স্টাইল

সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলাটি চলছে নেপালের জটিল ভূ-রাজনীতিতে। নির্বাচনের আগে বালেনের দল বলেছিল, তারা ভারত বা চীনের ‘বাফার স্টেট’ বা পকেট রাষ্ট্র হয়ে থাকবে না। কিন্তু চীন বা ভারতকে পাস কাটিয়ে নেপালে হঠাৎ অভূতপূর্ব প্রভাব বাড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর কাঠমান্ডু সফরের পর বেইজিংয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। চীন মনে করছে, বালেন সরকারের ভেতরে এমন এক শক্তিশালী চক্র আছে যারা তিব্বতি বিদ্রোহীদের মদদ দিচ্ছে। অন্যদিকে, সমান ক্ষুব্ধ ভারতও। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির কাঠমান্ডু সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, বালেন শাহ তাঁর চেয়ে নিচের পদমর্যাদার কোনো বিদেশি কর্মকর্তার সাথে এক টেবিলে বসতে রাজি নন।

নেপালের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ──> বালেন সরকার ──> চীন ও ভারতের উদ্বেগ 

আধুনিক নেপালের প্রতিষ্ঠাতা পৃথিবী নারায়ণ শাহর ‘দুই পাথরের মাঝখানের তরমুজ’ নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বালেন শাহ এক নতুন খেলায় মেতেছেন। তবে এত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকটের মাঝেও বালেন শাহ প্রতিনিয়ত আলোচনায় আছেন তাঁর পোশাকী ফ্যাশন নিয়ে। পার্লামেন্টে প্রথাবদ্ধ নেপালি পোশাকের বদলে জমকালো ব্লেজার, চোখে কালো চশমা আর পায়ে স্পোর্টস শু পরে হাজির হওয়া তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। ভক্তদের দাবি, এই কালো চশমা আর কালো কাপড়ের আসক্তি নাকি প্রধানমন্ত্রীর ‘নমনীয় কিন্তু দৃঢ়’ শাসননীতির ইঙ্গিত। মুখে কথা না বলে ড্রেস কোড বদলে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার এই পপ-কালচার স্টাইল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

দিনশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্র পরিচালনা কি কেবলই জনপ্রিয়তার জোয়ার, চমকপ্রদ স্টাইল আর বুলডোজারের খেলা? নাকি এর জন্য প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতা? নেপালের এই তরুণ সরকার কি পারবে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন আশার আলো হতে, নাকি পপ-কালচারের এই বেলুন খুব দ্রুতই ফুটে যাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে কাঠমান্ডুর আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


এ জাতীয় আরো খবর...