ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ফিরেছেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম অনলাইনভিত্তিক যুব আন্দোলন প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল মাধ্যম ছেড়ে সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে রূপ নিল। গত দুই বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা ৩০ বছর বয়সী এই যুব নেতা ভারতে পা রাখলে গ্রেপ্তার হতে পারেন—এমন শঙ্কায় তাঁর পরিবার এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা দীর্ঘ সময় ধরে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। তবে সমস্ত ভয় উপেক্ষা করে আজ শনিবার তিনি দিল্লিতে পৌঁছানোর পর থেকেই আন্দোলন এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
অভিজিতের আগমনকে কেন্দ্র করে আজ শনিবার সকাল থেকেই মধ্য দিল্লির রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জন্তর মন্তর এলাকা এবং তার আশপাশের সড়কগুলোতে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে নয়াদিল্লি পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ বেশ কিছু প্রধান সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় শত শত বিক্ষোভকারী তরুণ জড়ো হয়ে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগান দিতে থাকেন। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বর্তমান কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগ। বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাউডস্পিকার ব্যবহার করে জনতাকে শান্ত থাকার এবং নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনা দিতে থাকেন।
এই আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে মোদি সরকার ককরোচ জনতা পার্টির অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টটি ভারতজুড়ে ব্লক করে দিয়েছে। সরকারের এই সেন্সরশিপের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইতিমধ্যেই দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে সংগঠনটি। অপরদিকে, ক্ষমতাসীন সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এই আন্দোলনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, এই গোষ্ঠীটি ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ‘ভারতবিরোধী চক্রের’ কাছ থেকে অর্থ ও অনুসারী সংগ্রহের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সরকারের এমন দমনপীড়ন ও নেতিবাচক প্রচারণার পরও মে মাসের মাঝামাঝি যাত্রা শুরু করার পর থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ অনুসারী সংগ্রহ করেছে এই সংগঠনটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে এটিই এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় এবং স্বতঃস্ফূর্ত অনলাইন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ভারতের রাজনীতিতে মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনে জয়লাভ করলেও, ককরোচ জনতা পার্টির এই নজিরবিহীন জনপ্রিয়তা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে শুরু করেছে। বিশেষ করে দেশজুড়ে ব্যাপক যুব বেকারত্ব এবং একের পর এক জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা—যা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে—তরুণ সমাজকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এর সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে চলমান ইরান যুদ্ধজনিত তীব্র গ্যাস সংকট এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্দোলনের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এটি দেশের বঞ্চিত যুবসমাজের অধিকার আদায়ের একটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন। তিনি আরও যোগ করেন, অভিজিত দিপকে ভারতের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নেমেছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতে বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-যুবকের সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত গতিতে বাড়লেও, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কৃষি-বহির্ভূত খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের শহরাঞ্চলে যুব বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। ফলে কোটি কোটি উচ্চশিক্ষিত তরুণ তাঁদের মেধা ও দক্ষতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো চাকরি না পেয়ে অত্যন্ত স্বল্প বেতনের এবং অনিরাপদ কর্মক্ষেত্রে আটকে আছেন, যা তাঁদের মনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আর এই ক্ষোভকেই এখন রাজপথের আন্দোলনে রূপ দিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি।