রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

যুদ্ধবিরতিতেও বন্ধ নেই গাজা-লেবানন ও ইরানে হামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যখনই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানো কিংবা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে, ঠিক তখনই সমান্তরালভাবে মাটির বাস্তবতায় ঝরতে থাকে সাধারণ মানুষের রক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে গাজা, লেবানন ও ইরানের আকাশে কাগজে-কলমে একাধিক যুদ্ধবিরতি বলবৎ হলেও মাঠপর্যায়ের সহিংসতা, বিমান হামলা এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানি থামেনি। গত বুধবার ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার ঠিক আগে গত ১৬ এপ্রিলও উভয় পক্ষ একই ধরনের একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল। অন্যদিকে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এমনকি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে ২০编制৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি জারি রয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত আইনি ও রাজনৈতিক নথির কার্যকারিতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিদিন বোমাবর্ষণ চলছে। এই বৈপরীত্য বিশ্ববাসীর মনে এক বড় প্রশ্ন উস্কে দিয়েছে—যুদ্ধবিরতি আসলে কার স্বার্থে এবং কেন আন্তর্জাতিক আইন এই ভঙ্গুর পরিস্থিতি রুখতে পারছে না?

যুদ্ধবিরতির আড়ালে চলমান ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র

কাগজে সই হওয়া শান্তি বা যুদ্ধবিরতির চুক্তি যে কতটা অর্থহীন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলছে লেবানন ও গাজার মাটিতে। গত বুধবার নতুন করে চুক্তি হওয়ার পরও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আগ্রাসন স্তিমিত হয়নি। গত শুক্রবারও দক্ষিণ লেবাননের নাকৌরা এবং নাবাতিয়েহ জেলায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

অনুরূপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধেও। ৮ এপ্রিলের চুক্তির পরও দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন ও মারাত্মক সব সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে, যার তীব্রতা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বহুগুণ বেড়েছে। এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তেহরান সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। ইরানের স্পষ্ট অভিযোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইরানবিরোধী হামলা চালায়, তখন এই প্রতিবেশী দেশগুলো ওয়াশিংটনকে তাদের ভূখণ্ড ও লজিস্টিকস ব্যবহার করতে দিয়ে পরোক্ষ সহযোগিতা করেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ও অমানবিক চিত্রটি দেখা যাচ্ছে গাজায়। দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকার পরও সেখানে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক আগ্রাসন অবিরত চলছে। চলতি সপ্তাহেই গাজার একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় একই পরিবারের ৯ জন নিহত হয়েছেন। অথচ এই যুদ্ধবিরতির মূল লক্ষ্যই ছিল ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান এই বর্বরোচিত জাতিগত নিধনযজ্ঞের স্থায়ী অবসান ঘটানো।

যুদ্ধবিরতির রাজনৈতিক রূপ বনাম কৌশলগত চাল

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, যুদ্ধবিরতিকে কখনোই একটি স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব দ্য ফ্রেজার ভ্যালির অপরাধ বিচার ও অপরাধ তত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেনের মতে, যুদ্ধবিরতি হলো মূলত একটি সামরিক কৌশল, যা সাময়িকভাবে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখে। এটি মূলত দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগ বা সময় তৈরি করে দেয়, তবে এর স্থায়িত্ব একেবারেই ক্ষণস্থায়ী।

অন্যদিকে, কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাইকেল লিংকের মতে, যুদ্ধবিরতি কোনো শক্তিশালী আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি নিছক রাজনৈতিক চুক্তি। কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে যেমন একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ বা গ্যারান্টিদাতা থাকে, যারা চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করে; যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে তা থাকে না। ফলে যেকোনো পক্ষ খুব সহজেই এটি লঙ্ঘন করতে পারে এবং এর জন্য তাদের তাৎক্ষণিক কোনো আইনি বা সামরিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হয় না। গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই মধ্যস্থতাকারী ও তদারককারীর ভূমিকা পালন করছে। বৈশ্বিক উত্তর বা উন্নত বিশ্বের কিছু দেশ ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের মৃদু সমালোচনা করলেও, ওয়াশিংটন যেভাবে ইসরায়েলকে বারবার চুক্তি লঙ্ঘনের ছাড় দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে তারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

আইনি দুর্বলতা ও জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতার পক্ষাঘাত

ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের মতে, তাত্ত্বিকভাবে যুদ্ধবিরতি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বাধ্যতামূলক। কিন্তু এর স্বভাবগত কাঠামো অত্যন্ত নাজুক। কারণ, এটি কেবল সাময়িকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের বন্দুকের নলগুলোকে শান্ত রাখে, কিন্তু মূল সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। এটি লড়াই থামায় ঠিকই, কিন্তু সশস্ত্র সংঘাতের আইনি অবসান ঘটাতে পারে না।

মাইকেল লিংক মনে করেন, একটি যুদ্ধবিরতি তখনই সফল হতে পারে, যখন এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি শান্তি পরিকল্পনা যুক্ত থাকে। গাজার ক্ষেত্রে এমন একটি শান্তি পরিকল্পনা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছিল, যেখানে সদিচ্ছার সাথে এবং অবিলম্বে চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। তাত্ত্বিকভাবে, কোনো দেশ এই চুক্তি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে নালিশ জানাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘ভিটো’ ক্ষমতা রয়েছে, তার কারণে ইসরায়েল কিংবা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক বা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব। ফলে এই আন্তর্জাতিক আইনগুলো শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাধরদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।

নিরপেক্ষ তদারকির অভাব ও আত্মরক্ষার অপব্যাখ্যা

টবি ক্যাডম্যানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মহলে এমন কোনো নিরপেক্ষ ও বাধ্যতামূলক ক্ষমতাধর কর্তৃপক্ষ নেই, যারা চূড়ান্ত রায় দিতে পারে যে কোন পক্ষ আগে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। গাজা, লেবানন ও ইরানে যেসব পর্যবেক্ষণ দল রয়েছে, সেগুলো মূলত মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে। আর এখানে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখানে মধ্যস্থতাকারী এবং একই সাথে সে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মিত্র। ফলে যেকোনো পক্ষ চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুললে, তার নিরপেক্ষ আইনি মূল্যায়নের বদলে কেবল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে বিচার করা হয়।

আন্তর্জাতিক আইনের এই অকার্যকারিতা প্রসঙ্গে অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেন বলেন, গাজা ও লেবাননের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ভেতরের এক চরম দেউলিয়াত্বকে উন্মোচিত করেছে। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই মনে করে যে সেখানে যা ঘটছে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন ও বেআইনি। কিন্তু এই সম্মিলিত স্বীকৃতিও মাঠপর্যায়ের রক্তপাত থামাতে পারছে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কিংবা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) হয়তো তদন্ত করতে পারে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে; কিন্তু তাদের নিজস্ব কোনো সামরিক বাহিনী নেই যা দিয়ে তারা চলমান বোমাবর্ষণ থামাতে পারে।

এর ওপর যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ (Self-defense)-এর চরম অপব্যাখ্যা। ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত তাদের এই আগ্রাসনের পক্ষে আত্মরক্ষার যুক্তি দাঁড় করায়। কিন্তু টবি ক্যাডম্যান স্পষ্ট করে বলেছেন, ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ কেবল তাৎক্ষণিক বা সন্নিকট কোনো হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার দেয়, এটি কোনো রাষ্ট্রকে অন্য দেশের ওপর স্থায়ীভাবে বা প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়ে যাওয়ার লাইসেন্স দেয় না।

ট্রাম্পের মন্তব্য ও আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যখন এই অঞ্চলের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তিনি অত্যন্ত নিস্পৃহ ও বাস্তববাদী এক মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের ভাষায়:

“বিশ্বের ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি মানে হলো—আপনি আরও সংযতভাবে এবং বেছে বেছে গুলি বা বোমাবর্ষণ করছেন।”

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্টের এই একটি বাক্যই বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আসল নগ্ন রূপটি প্রকাশ করে দেয়। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো অভাব নেই, অভাব রয়েছে তা সমতার ভিত্তিতে সবার ওপর প্রয়োগ করার। যতদিন পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে আইনকে বেছে বেছে এবং পক্ষপাতমূলকভাবে প্রয়োগ করবে, ততদিন মধ্যস্থতাকারীদের কাগজের যুদ্ধবিরতি কেবলই এক ফাঁকা বুলি হিসেবে থেকে যাবে, আর মধ্যপ্রাচ্যের মাটি সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হতেই থাকবে।


এ জাতীয় আরো খবর...