সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

সব মন্ত্রণালয়ে কড়া নজরদারি, জামায়াতের গোপন ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক চমকপ্রদ ও কৌশলগত নতুন ডামাডোল শুরু হয়েছে। বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা, সংসদে সরকারি সিদ্ধান্তের বিকল্প নীতিপ্রস্তাব পেশ এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের খুঁটিনাটি কার্যক্রমের ওপর কড়া নজরদারি রাখতে একটি শক্তিশালী ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ (Shadow Government) গঠন করেছে। দলীয় দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, গত মাসেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই বিশেষ কাঠামোটি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে তীক্ষ্ণ নজর রাখা। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত আপাতত কৌশলগত কারণে এই ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম বা দাপ্তরিক তালিকা প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে না। তবে তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব গতিতে ও পেশাদারিত্বের সাথে পর্দার আড়াল থেকে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ফাইল, নীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির খতিয়ান পর্যবেক্ষণ করার কাজ পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে।

জামায়াতের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারকে কার্যকরভাবে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা। কোন মন্ত্রণালয় কী ধরনের নীতিগত ভুল করছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোথায় কী অনিয়ম বা দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে—তা এই কাঠামোর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জনগণের সামনে ও সংসদের ভেতরে তুলে ধরা হবে।

‘পাবলিকলি ঘোষণা কাজের জন্য নয়’—নেতৃবৃন্দের বক্তব্য

ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন জানান:

“আমরা একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছি এবং এর বিভিন্ন উইং ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিদিনের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এটি আসলে স্রেফ মিডিয়ায় পাবলিকলি বা জনসমক্ষে ঘোষণা করার জন্য তৈরি করা হয়নি, বরং মাঠপর্যায়ে বাস্তবিক ও গুণগত কাজ করার জন্য গঠন করা হয়েছে। আপাতত আমরা কৌশলগত কারণে এই তালিকা জনসমক্ষে আনছি না, তবে প্রয়োজন মনে হলে অবশ্যই ভবিষ্যতে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।”

বাজেট অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে সরকারের সমান্তরালে কোনো ‘ছায়া বাজেট’ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এই সংসদ সদস্য জানান যে, কেমন বাজেট দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় এবং কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার; সেসব বিষয়ে সরকারের বাজেট ঘোষণার আগেই আগামী দুই-একদিনের মধ্যে জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি বিকল্প ও সমৃদ্ধ বাজেট প্রস্তাবনা বা গাইডলাইন জাতির সামনে পেশ করা হবে। এছাড়া সংসদেও দলের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা এ নিয়ে জোরালো ভূমিকা রাখবেন।

দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ সিদ্ধান্তে গত মাসেই এই কাঠামো অনুমোদন পায়। এই মন্ত্রিসভায় কারা আছেন—তা স্পষ্ট না করলেও তিনি ইঙ্গিত দেন যে, দলের শীর্ষ ও প্রবীণ নেতাদের নিয়ে এটি গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে সংগঠনের এমন অনেক সিনিয়র ও পলিসি বিশেষজ্ঞ নেতা রয়েছেন যারা বর্তমানে সংসদ সদস্য (এমপি) নন। মূলত আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা শিক্ষক, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা ও বিভিন্ন খাতভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের এই ছায়াতলে যুক্ত করা হয়েছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও পলিসি সামিটে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রসাত্মক ‘উজিরে খামোখা’ বনাম হুইপের সাধুবাদ

সংসদীয় গণতন্ত্রের এই পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে খোদ সরকারের শীর্ষ মহলে মিশ্র ও বেশ কৌতুকপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনাকালে বিরোধী দলের এই ছায়া মন্ত্রিসভাকে তীব্র কটাক্ষ ও রসাত্মক ভঙ্গিতে ‘উজিরে খামোখা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি সংসদে স্বকীয় ঢঙে বলেন, “আমি জেনে খুশি হয়েছি আপনারা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। ছায়া মন্ত্রিসভা করলে দুইটা লাভ—একটা হলো যে দায়িত্ববোধ বাড়ে, আর একটা হলো যে ‘উজিরে খামোখা’ বা মন্ত্রী মন্ত্রী ভাবের একটা অবাস্তব সুখ পাওয়া যায়। আমি তাদের অভিনন্দন জানাই।”

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে জামায়াতের এই উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক স্বার্থে স্বাগত জানিয়েছেন সংসদের অন্যতম হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক সুর মিলিয়ে বলেন, “ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ভালো একটি দিক। যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই এই শ্যাডো ক্যাবিনেট ব্যবস্থা চালু আছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারকে সঠিক জবাবদিহিতার আওতায় রাখা যায়। আমি একজন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে এই ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাধুবাদ জানাই।” তিনি আরও যোগ করেন, এর মাধ্যমে বিরোধী দল সরকারকে কেবল অন্ধভাবে নেতিবাচকভাবে পেশ না করে, কোন কাজটি দেশের জন্য ভালো আর কোনটি মন্দ—তা প্রশংসার ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারবে।

জোটের বাইরে একক সিদ্ধান্ত: এনসিপি ও এবি পার্টির ভিন্ন অবস্থান

ইউকে বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা’ থেকে আসা এই ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি জামায়াত বাস্তবায়ন করলেও, এর সাথে তাদের রাজনৈতিক জোটসঙ্গীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই। দলটির একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, শুরুতে জোটগতভাবে একটি একক যৌথ ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও নানা সমীকরণে শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী সম্পূর্ণ নিজস্ব দলগত শক্তিতে এটি গঠন করেছে। এ নিয়ে জোটের অন্যান্য শরিকদের সঙ্গে কেবল মৌখিকভাবে বিচ্ছিন্ন কিছু কথা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো যৌথ বৈঠক বা সিদ্ধান্ত হয়নি।

এই বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের একটি প্রাথমিক প্রস্তাবের কথা জামায়াত আমাদের পূর্বে বলেছিল। তবে এর সঙ্গে দলগতভাবে আমাদের নাগরিক পার্টির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বা দায় নেই। তাদের ছায়া মন্ত্রিসভার বর্তমান খবর বা অবস্থান কী, তা কেবল তারাই বলতে পারবে; আমরা মাঠে আমাদের নিজস্ব কর্মসূচি ও কাজ করছি।”

অন্যদিকে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক ভিন্ন দাবি তুলে ধরে বলেন, “ছায়া মন্ত্রিসভা বা শ্যাডো গভর্মেন্টের ধারণাটি নীতিগতভাবে মূলত এবি পার্টির মৌলিক আইডিয়া। এ বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরাই সর্বপ্রথম জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছিলাম। তবে জামায়াত যে দলগতভাবে এমন একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেছে, তা আমাদের জানা নেই। এটি তারা তাদের দলীয় ফোরামে করতেই পারে। এমনকি আমরা শুনেছি বর্তমান ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার এনসিপিও (NCP) ভেতরে ভেতরে এমন একটি ছায়া কাঠামো গঠনের চেষ্টা করছে।” সব মিলিয়ে, এই নতুন ছায়া মন্ত্রিসভাকে ঘিরে বাজেট অধিবেশনের প্রাক্কালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ও গুণগত পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


এ জাতীয় আরো খবর...