সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ন

কিলিং ও পুশইনে প্রশ্নের মুখে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে নয়াদিল্লি প্রতিনিয়ত ঢাকার বর্তমান বিএনপি সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়নের বার্তা দিচ্ছে; অন্যদিকে ঠিক বিপরীত আচরণ করে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে শত শত মানুষকে বাংলাদেশে পুশইনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সীমান্ত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ হিসেবে কেবল মুসলিম হওয়ার কারণেই সাধারণ মানুষদের জোরপূর্বক পুশইন করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দল বিজেপির সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয় এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সীমান্তে এই আগ্রাসী প্রবণতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই সংকটের মুখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর প্রতিরোধমূলক অবস্থান গ্রহণ করায় ভারতের এই অপেশাদার ও অমানবিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এর সাথে প্রায় নিয়মিত বিরতিতে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যার ঘটনা অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের জনগণ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

সাবেক কূটনীতিবিদদের উদ্বেগ ও কূটনৈতিক চ্যানেলের তাগিদ

সীমান্তে ভারতের এই সাংঘর্ষিক আচরণকে নয়াদিল্লির ‘মিশ্র বার্তা’ বা দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল দিল্লিতে এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন যে ভারতে বসবাসকারী অবৈধ বাংলাদেশিদের বিষয়ে বাংলাদেশ যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। সার্বভৌম দেশ হিসেবে ভারতের এই নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রস্তাবটি কূটনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই কেন বিএসএফ সীমান্তে জোরপূর্বক পুশইনের অমানবিক পথ বেছে নিল? তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সীমান্তে বিএসএফের এই জঘন্য আচরণের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজিবির সাথে একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। যদি এই সংকটে দুই দেশের সাধারণ জনগণ সরাসরি সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে, তবে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হবে এবং এক নতুন আঞ্চলিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই এই বিষাক্ত উত্তেজনা পরিহার করে দুই দেশের উচিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আইনি সমাধান খোঁজা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া বার্তা ও প্রত্যাবাসনের আন্তর্জাতিক নিয়ম

ভারতের এই হঠাৎ উগ্র অবস্থানের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২ জুন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশইন বা পুশব্যাকের তীব্র বিরোধী। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার আসার পর পুশইনের ঘটনা বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারের পূর্ণ নজরে রয়েছে এবং সীমান্তে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও ‘হার্ডলাইন’ অবস্থানে রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন:

“কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মূল নাগরিক হন এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থান করেন, তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কোনোভাবেই পুশইনের মতো অপেশাদার উপায়ে নয়।”

স্বার্থের সম্পর্ক বনাম ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন

রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকন উদ্দিন (অব.) এই সম্পর্ককে গভীর সমালোচনার চোখে দেখছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কখনোই সমমর্যাদার বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি, এটি মূলত ভারতের একতরফা স্বার্থের সম্পর্ক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ভারতকে একচেটিয়া প্রাধান্য দিয়ে সব কাজ করলেও, তিস্তা বা গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা কিংবা সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো বাংলাদেশের কোনো মৌলিক দাবিই ভারত পূরণ করেনি। বিএনপি সরকার সব সময় বৈশ্বিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাকে গুরুত্ব দেয় এবং বর্তমান সরকারের সঙ্গেও ভারত কৌশলগত কারণে সম্পর্ক উন্নয়নের সুন্দর সুন্দর বুলি আওড়াচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিএসএফ জিরো লাইন অতিক্রম করে কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে, ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে বাংলাদেশের কৃষিজমির ক্ষতি করছে এবং বাংলাদেশিদের হত্যা করছে। তিনি মনে করেন, বিগত সরকারের নতজানু নীতির কারণে ভারত আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ এজেন্ডা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সাহস পেয়েছে, যার বিরুদ্ধে এখন কঠোর আইনি ও কূটনৈতিক মোকাবিলা প্রয়োজন।

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় এবং দিল্লির নীরবতা

এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে আরেকটি বড় ও যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন দেশের প্রবীণ কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখন কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ তাড়াতে এত হুংকার দিচ্ছেন, তখন ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে বাংলাদেশে অপরাধ করে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকশ চিহ্নিত নেতার বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ নিরুত্তর। বাংলাদেশের মানুষ আজ স্পষ্টভাবে জানতে চায়, দিল্লিতে বিলাসী আশ্রয় পাওয়া এই পলাতক অপরাধীদের বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী? বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের যদি পুশইন করার এতই শখ থাকে, তবে বাংলাদেশের আদালতের ওয়ারেন্টভুক্ত এই চিহ্নিত অপরাধীদের কেন পুশইন করে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হচ্ছে না? এই বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন বিজেপির বিশেষ ‘রাজনৈতিক মেহমান’। তাই তাঁদের সসম্মানে পাহারা দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে ভারতেরই হতদরিদ্র মুসলিম নাগরিকদের জোরপূর্বক নোম্যান্স ল্যান্ডে ঠেলে দিয়ে এক চরম অমানবিক ও মানবেতর ট্র্যাজেডির জন্ম দেওয়া হচ্ছে—যা ঢাকা-দিল্লির বন্ধুত্বের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...