সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

ভূমি কর্মকর্তাদের বদলি ও সম্পদের হিসাবে আল্টিমেটাম

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলি বা পছন্দসই কর্মস্থল পরিবর্তনের জন্য প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির করার অনৈতিক প্রবণতা বন্ধে আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা গণমাধ্যমের প্রভাব খাটিয়ে যেকোনো ধরনের তদবির বা সুপারিশ করাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পুনরায় কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই ধরনের অন্যায্য তদবির ও চাপ প্রয়োগের সংস্কৃতি ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর সুনির্দিষ্ট ধারার পরিপন্থী এবং এটি চাকরিবিধির আলোকে এক চরম ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে। যারা এই রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা অমান্য করে পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

এই সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত জরুরি ও কঠোর নির্দেশনাপত্র গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), দেশের সমস্ত বিভাগীয় কমিশনার এবং সকল জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে এই চিঠির অনুলিপি ও নির্দেশনা মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সকল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার, উপভূমি সংস্কার কমিশনার, চার্জ অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট সকল শীর্ষ দপ্তরে বাস্তবায়নের জন্য পাঠানো হয়েছে। মূলত পূর্বের তথা ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বরের দিকনির্দেশনা ও পরিপত্রটি মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা সঠিকভাবে তোয়াক্কা না করায় এই জরুরি তাগিদ দেওয়া হলো।

আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন ও মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্টের খতিয়ান

ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন যে, মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা ও লোভনীয় পোস্টিংয়ের আশায় নিয়মিত আইনবহির্ভূত পন্থার আশ্রয় নিচ্ছেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে প্রতিনিয়ত সচিবালয়ে তদবির করানো হচ্ছে। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, সরকারি চাকরিতে থেকে এই ধরনের বাহ্যিক প্রভাব খাটানো ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী গুরুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। তাছাড়া এই সমস্ত অনাকাঙ্ক্ষিত তদবিরের কারণে প্রশাসনের প্রতিদিনের মূল্যবান বহু কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত জনসেবামূলক অফিসের কাজকর্মে মনোনিবেশ করা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ভূমি খাতকে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করার যে মহাপরিকল্পনা সরকার নিয়েছে, আমলাদের এই বদলি বিলাস ও তদবির বাণিজ্য তার অন্যতম প্রধান অন্তরায়।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই তদবিরের কুফলগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আচরণ বিধিমালার সুনির্দিষ্ট তিনটি ধারা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে:

  • ২০ নম্বর বিধি: কোনো সরকারি কর্মচারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর নিজের চাকরির স্বার্থে কোনো সংসদ সদস্য বা অসরকারি কোনো ব্যক্তির কাছে গিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ বা দ্বারস্থ হতে পারবেন না।

  • ৩০ নম্বর বিধি: কোনো কর্মচারী তাঁর চাকরি সংক্রান্ত কোনো দাবি-দাওয়া বা সুযোগ-সুবিধার সমর্থনে সরকার কিংবা কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ওপর রাজনৈতিক বা বাইরের কোনো চাপ প্রয়োগ বা প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারবেন না।

  • ৩২ নম্বর বিধি: উপরোক্ত যেকোনো বিধি বা আইনি ধারা লঙ্ঘন করা সরাসরি অসদাচরণ হিসেবে সাব্যস্ত হবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে কর্মচারীকে লঘুদণ্ড বা চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড দেওয়া যাবে।

সম্পদের হিসাব জমা না দেওয়ায় অসন্তোষ ও ২৫ জুনের ডেডলাইন

তদবির সংস্কৃতির পাশাপাশি ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয়ের উৎস এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বিশাল ধোঁয়াশা ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর আগে বিগত ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের সকল কর্মচারীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার জন্য একটি কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনক ও দুঃখজনক বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও মাঠপর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ বা সন্তোষজনক তথ্যের বিবরণী মন্ত্রণালয়ে এসে পৌঁছায়নি। কর্মচারীদের এই আইন অমান্য করার এবং তথ্য লুকিয়ে রাখার প্রবণতায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মন্ত্রণালয়।

“মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের এমন গাফিলতি ও তথ্য গোপনের পর গত ৩ জুন দেশের সকল জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে একটি অত্যন্ত কড়া ও বিশেষ তাগিদপত্র পাঠিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এই পত্রে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আগামী ২৫ জুনের মধ্যে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী মাঠপর্যায়ের রাজস্ব প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সকল কর্মচারীকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজেদের ও পরিবারের সম্পদের সঠিক হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে।”

স্বচ্ছ ভূমি ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ

এই কঠোর হিসাব বিবরণীর আওতায় উপজেলা ভূমি অফিস, রাজস্ব সার্কেল অফিস এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রধান চালিকাশক্তিদের আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন কানুনগো, সার্ভেয়ার, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার), ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা, প্রসেস সার্ভার, অফিস সহায়ক, চেইনম্যান এবং নিরাপত্তা প্রহরীরা। উল্লেখ্য, মাঠপর্যায়ের সহকারী কমিশনার বা এসিল্যান্ড ব্যতীত বাকি সকল স্তরের কর্মচারীদের জন্য এই সম্পদের হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই নির্ধারিত সময়সীমা বা ডেডলাইনের মধ্যে তথ্য পাঠাতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ডিসিদের এই প্রক্রিয়াটি কঠোরভাবে তদারকি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও ভূমি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের সাধারণ মানুষের ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও হয়রানির অন্যতম প্রধান কারণ হলো মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের জবাবদিহিতার অভাব এবং দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জনগণের কল্যাণে একটি স্বচ্ছ ও সম্পূর্ণ জনবান্ধব আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। সেই লক্ষ্য পূরণে ভূমি অধিগ্রহণে শতভাগ স্বচ্ছতা আনা এবং সরকারি জমি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করতে উর্ধ্বতন প্রশাসন এখন বদ্ধপরিকর। আর এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ করা এবং বদলি সংক্রান্ত কালোবাজারি রোধ করা আবশ্যক। ২৫ জুনের এই আল্টিমেটাম এবং তদবিরের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের এই আপসহীন অবস্থান যদি বাস্তবে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবেই কেবল দেশের ভূমি সেবায় সাধারণ মানুষের বহুল প্রত্যাশিত মুক্তি ও সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট


এ জাতীয় আরো খবর...