বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

লিঙ্গোত্থানজনিত সমস্যা: বড় রোগের আগাম সংকেত

বিবিসি বাংলা / ৪ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

পুরুষের লিঙ্গোত্থানজনিত অক্ষমতা বা ইরেক্টাইল ডিসফাংশনকে (ইডি) সাধারণ মানুষ কেবলই একটি গোপন বা অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন সমস্যা হিসেবে দেখে থাকেন। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণার তথ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। পুরুষাঙ্গ মূলত পুরুষের অভ্যন্তরীণ রক্তসঞ্চালন ও সামগ্রিক শারীরিক ফিটনেসের একটি জীবন্ত পরিমাপক বা ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে। চিকিৎসকদের মতে, এই শারীরিক অক্ষমতাটি আসলে শরীরে নিঃশব্দে বাসা বাঁধতে থাকা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস কিংবা স্মৃতিভ্রমের (ডিমেনশিয়া) মতো ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী রোগগুলোর একটি অত্যন্ত স্পষ্ট আগাম বিপদসংকেত। দুঃখজনকভাবে, সামাজিক কুসংস্কার ও তীব্র লজ্জার কারণে এই নীরব মহামারি নিয়ে রোগীরা যেমন মুখ খোলেন না, তেমনি অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরাও বিষয়টি এড়িয়ে যান। ফলে কোনো বড় ধরনের রোগ শরীরে মারাত্মক আকার ধারণ করার আগেই তা শনাক্ত করার একটি গোল্ডেন সুযোগ পুরুষেরা হারিয়ে ফেলেন।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এই সমস্যার এক ভয়ংকর ও ব্যাপক চিত্র ফুটে ওঠে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মাঝে বিভিন্ন দেশে এর বিস্তৃতি ৩ শতাংশ থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে ৭৬.৫ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে। প্রায় ১,২০০ জন পুরুষের ওপর চালানো একটি অত্যন্ত নিবিড় ও সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪০ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশই নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে এই পুরুষত্বহীনতার শিকার হন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ঝুঁকির পারদও দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে, যা ৭০ বছর বয়সে পৌঁছে এক লাফে ৬৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। পরিসংখ্যান আরও বলছে, যেসব পুরুষ এই লিঙ্গোত্থানজনিত জটিলতায় ভুগছেন, সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫৯ শতাংশ বেশি এবং মস্তিষ্কে স্ট্রোক করার ঝুঁকি ৩৪ শতাংশ বেশি থাকে।

এই পুরো বিষয়টি কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে হলে মানুষের শরীরের রক্তনালী ও স্নায়ুতন্ত্রের মেকানিজম জানা জরুরি। পুরুষের অঙ্গটির দৈর্ঘ্য বরাবর স্পঞ্জের মতো দুটি নলাকার সিলিন্ডারের মতো কাঠামো থাকে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘কর্পোরা ক্যাভারনোসা’ বলা হয়। সাধারণ অবস্থায় এটি সম্পূর্ণ শিথিল থাকে। কিন্তু যখনই একজন পুরুষ মানসিকভাবে উত্তেজিত হন, তখন তাঁর মস্তিষ্ক থেকে ধমনীগুলোর চারপাশে বিশেষ সংকেত পৌঁছায় এবং পেশীগুলো শিথিল হয়ে যায়। এর ফলে ওই স্পঞ্জের মতো সিলিন্ডার দুটিতে রক্তের প্রবাহ অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায় এবং রক্ত আটকে গিয়ে অঙ্গটি শক্ত ও প্রসারিত হয়। এখন কোনো কারণে যদি শরীরের রক্তনালী বা নালীপথে রক্ত চলাচলের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়, তবেই লিঙ্গোত্থান প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

অনেক সময় এই সমস্যার পেছনে শারীরিক কারণের পাশাপাশি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক কারণও জড়িত থাকে। আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রায় মানুষ প্রতিনিয়ত যে মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যায়, তা শরীরকে এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক মোডে নিয়ে যায়। এই তীব্র মানসিক চাপের ফলে শরীর থেকে অ্যাড্রেলালিন ও কর্টিসল নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে ফেলে এবং কর্পোরা ক্যাভারনোসাকে শক্ত হতে বাধা দেয়। পাশাপাশি, অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে পুরুষের প্রধান সেক্স হরমোন ‘টেস্টোস্টেরন’ উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, যা যৌন আকাঙ্ক্ষা ও উত্তেজনা দুটোই ধূলিসাৎ করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আদিম যুগে পরিবেশ যখন ঝুঁকিপূর্ণ বা প্রতিকূল থাকত, তখন শরীর প্রজননের চেয়ে টিকে থাকাকে বেশি গুরুত্ব দিত। আধুনিক যুগের মানসিক চাপ শরীরের এই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সক্রিয় করে তুলছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে যৌন সক্ষমতা হারিয়ে।

তবে সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো, পুরুষাঙ্গের ধমনীগুলো মানুষের শরীরের অন্যতম ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম ধমনী। তাই যখন কোনো মানুষের শরীরে অ্যাথেরোসক্লেরোসিস (রক্তনালী শক্ত ও সরু হয়ে যাওয়ার রোগ) শুরু হয়, তখন বড় ধমনীগুলোর আগে এই সূক্ষ্ম ধমনীগুলোই সবার আগে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির প্রজনন বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ মাইকেল ক্যারলের মতে, রক্তনালীর স্বাস্থ্য কতটা ভালো বা মন্দ, তার সরাসরি প্রমাণ হলো একটি পারফেক্ট লিঙ্গোত্থান। তাই এই ধমনীগুলোর ক্ষতি হওয়া মানেই তা অদূর ভবিষ্যতে হার্ট ফেইলিউরের একটি বড় পূর্বাভাস। একইভাবে, তাইওয়ানের একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা ইডিতে আক্রান্ত পুরুষদের পরবর্তী ৭ বছরের মধ্যে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেশি, কারণ মানুষের মস্তিষ্কও তার বিষাক্ত বর্জ্য পরিষ্কার ও সচল থাকার জন্য ভালো রক্ত সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।

ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য এই স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক। রক্তে শর্করার বা গ্লুকোজের মাত্রা যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায়, তখন রক্তনালীর প্রাচীরে অতিরিক্ত গ্লুকোজ আটকে গিয়ে তার স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘গ্লাইকেশন’ বলা হয়। টাইপ-টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষদের ক্ষেত্রে এই লিঙ্গোত্থানের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ একজন মানুষের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি থাকে। স্পেনের বার্সেলোনার সান্ত পাউ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, ডায়াবেটিসের সাথে যদি কোনো পুরুষের এই যৌন সমস্যাটি দেখা দেয়, তবে তাঁর হাত ও পায়ের স্নায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া (পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি) এবং চোখের রেটিনা নষ্ট হয়ে অন্ধত্ব বরণ করার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা অনেক সময় অঙ্গচ্ছেদের মতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

যদিও যুক্তরাজ্যের ইউরোলজি ফাউন্ডেশনের একটি জরিপ বলছে, পুরুষেরা এই বিষয়টি নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার চেয়ে এক মাস মদ্যপান না করে কাটাতেও রাজি আছেন, তবুও লজ্জা ভেঙে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটাই জীবন বাঁচানোর মূল চাবিকাঠি। কারণ এই সমস্যাটি অনিরাময়যোগ্য কোনো ব্যাধি নয়। ভায়াগ্রার মতো ওষুধগুলো মূলত পুরুষের রক্তনালীকে প্রসারিত করার জন্য কাজ করে, যা মূলত শুরুতে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ৯ লাখ রোগীর ওপর চালানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের ওষুধ সেবনের ফলে রোগীদের হৃদরোগের অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার রোগের ঝুঁকিও প্রায় অর্ধেক কমে আসে। চিকিৎসকের কাছে এই সমস্যাটি অকপটে স্বীকার করলে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ বা জীবনযাত্রার ভুলভ্রান্তিগুলো সহজেই শুধরে নিয়ে বড় ধরনের অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

সবশেষে, রোম টর ভারগাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত সেক্সোলজিস্ট এমানুয়েলে জানিনি মানুষের বিবর্তনের এক চমৎকার তথ্য তুলে ধরেছেন। শিম্পাঞ্জিসহ পৃথিবীর প্রায় সব স্তন্যপায়ী ও প্রাইমেট প্রাণীর লিঙ্গে ‘ব্যাকুলাম’ নামক একটি শক্ত হাড় থাকে, যা তাদের যৌন সক্ষমতাকে ধরে রাখে। কিন্তু মানুষ বিবর্তনের ধারায় তার লিঙ্গের সেই হাড়টি হারিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতি মানুষের শরীর থেকে এই হাড়টি এই কারণেই বিলুপ্ত করেছে, যাতে নারীরা বুঝতে পারেন কোন পুরুষটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও ভালো রক্তসঞ্চালনের অধিকারী এবং কার জিন সন্তানদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। হাড় না থাকার কারণে মানুষের লিঙ্গোত্থান সম্পূর্ণভাবে একটি প্রাকৃতিক ও নিখুঁত ‘বায়োমার্কার’ বা শরীরের ভেতরের দীর্ঘস্থায়ী রোগ পরিমাপের এক চমৎকার আয়না হিসেবে কাজ করছে। তাই একে ঠাট্টা বা লজ্জার বিষয়ে না রেখে, শরীরের ভেতরের বড় রোগের আগাম ডিক্লেয়ারেশন বা অ্যালার্ম হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


এ জাতীয় আরো খবর...