শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ন

রংপুরের রাম-মূর্তি বিতর্ক: সেকুলার-লিবারাল নীতি, হিন্দুত্ববাদী প্রতীক ও বাংলাদেশের সার্বভৌম বাস্তবতা

মাওলানা মুনির আহমদ / ৪ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৪২ কিলোমিটার উত্তরের এক অনগ্রসর, শান্ত গ্রামীণ জনপদ। ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলে যে সাধারণ পল্লী-আবহ চোখে পড়ে, তা আজ আর কেবল কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক কিছু নজিরবিহীন ও রহস্যময় কর্মকাণ্ডের জেরে এই অঞ্চলটি এখন সমগ্র দেশের সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। গাইবান্ধার এই জনপদে, যেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী তথা হিন্দু জনবসতি তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম, সেখানে হঠাৎ করেই উন্মুক্ত স্থানে একের পর এক বিশালাকায় আকাশচুম্বী মূর্তি নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে ২৮ ফুট উঁচু শিবমূর্তি এবং ৫৩ ফুট উঁচু কৃষ্ণমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যার একটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খোদ রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমারের সরব উপস্থিতি ছিল। এখানেই শেষ নয়, একই প্রাঙ্গণে প্রায় সতেরো কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ১৪৪টি মূর্তি নির্মাণের এক মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এবার শুরু হয়েছিল এক অতিকায় রাম-বিগ্রহ নির্মাণের কর্মযজ্ঞ।

স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং সরকারি কোনো প্রকার আইনি অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত এই অস্বাভাবিক স্থাপত্য-তৎপরতা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিং ও ভূরাজনৈতিক নীলনকশার অংশ হিসেবেই এই আয়োজন চলছে- এমন তীব্র আশঙ্কায় গত ১১ জুন প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই রামমূর্তি নির্মাণের কাজ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে কাজ স্থগিত হলেও ধোঁয়াশা ও গভীর মেঘ কাটেনি। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল ও ব্যয়বহুল স্থাপত্যের আড়ালে কি কেবলই নিছক ধর্মীয় আবেগ কাজ করছে, নাকি এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো ভিনদেশী ইন্ধনে সাজানো অশুভ ‘ট্রোজন হর্স’ বা ছদ্মবেশী ধ্বংসাত্মক কৌশল?

এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের একশ্রেণির সেকুলার ও লিবারাল বুদ্ধিজীবী সমাজ যথারীতি তাদের চেনা ছকে অত্যন্ত সস্তা ও সরল একটি বয়ান হাজির করতে চাইছেন। তাদের যুক্তি হলো: “মন্দিরের নিজস্ব জায়গা, মন্দির কর্তৃপক্ষ সেখানে কী করবে বা কত বড় মূর্তি বানাবে; তাতে অন্যদের আপত্তি করার কী আছে? এটি তো ধর্মীয় স্বাধীনতার অংশ!” আপাতদৃষ্টিতে এই লিবারাল যুক্তির মধ্যে একটি চটকদার আকর্ষণ রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে, ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাস পালনের পূর্ণ অধিকার অবশ্যই থাকা উচিত। বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি কখনোই হিন্দু নাগরিকদের মন্দিরে পূজা-অর্চনা, প্রতিমা নির্মাণ বা ধর্মীয় উৎসব উদযাপনে বাধা দেয়নি, বরং সবসময়ই সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রেখেছে।

কিন্তু এই সরল সেকুলার ধোঁয়াশা হাজির করার পরও প্রশ্নটি এখানে শেষ হয়ে যায় না। কারণ, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর এই সংকটটি নিছক “ঘরের ভেতরের নিরীহ ধর্মচর্চা”র কোনো বিষয় নয়। যখন কোনো ধর্মীয় প্রতীক বা স্থাপত্য স্বাভাবিক নান্দনিকতার সীমা লঙ্ঘন করে অস্বাভাবিক ও দানবীয় আকারে দৃশ্যমান করা হয়; তাও আবার একটি অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর সময়ে; এবং এমন এক সীমান্তবর্তী ও ভূরাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে, তখন তা আর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিধিতে থাকে না। বিশেষ করে, যখন এই প্রতীকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রে দীর্ঘকাল ধরে মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, উচ্ছেদ এবং চরম আধিপত্য বিস্তারের এক আগ্রাসী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তখন তা সরাসরি একটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। ফলত, এটি আর ধর্মীয় অধিকারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক শান্তি, আইন-শৃঙ্খলা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্মৃতির গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা যে লিবারাল নীতির দোহাই দিয়ে বলছেন- “নিজের ধর্মীয় জায়গায় যা খুশি তা-ই করা যাবে”; সেই নীতিটি কি তাদের পরম আরাধ্য ও আদর্শ রাষ্ট্র ইউরোপ-আমেরিকাতেও মানা হয়? বাস্তবতার নির্মোহ আলোয় তাকালে দেখা যাবে, পশ্চিমা সেকুলার রাষ্ট্রগুলোতেও ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তরে মেনে নেওয়া হলেও, সেই ধর্ম যখন স্থাপত্য, শব্দ বা দৃশ্যমান অবয়বের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের সাংস্কৃতিক স্নায়ুকে স্পর্শ করে, তখন রাষ্ট্র সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেই মুসলিম নাগরিকদের মসজিদ নির্মাণ, মিনার তৈরি বা প্রকাশ্যে আজান প্রচারের বিষয়টিকে কেবলই ‘ধর্মীয় অধিকার’ হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয় না। বরং সেটিকে শহুরে নকশা, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার আলোকেই বিচার করা হয়।

সুইজারল্যান্ডের মতো তথাকথিত সভ্য দেশে গণভোটের মাধ্যমে মসজিদের মিনার নির্মাণ প্রত্যক্ষভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার সিংহভাগ দেশেই প্রকাশ্যে লাউডস্পিকারে আজান দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, দু-একটা জায়গায় সীমিত পরিসরে অনুমতি মিললেও তা কঠোর সময়সীমা, শব্দের মাত্রা এবং স্থানীয় প্রতিবেশীদের অনাপত্তির শর্ত সাপেক্ষে নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ, পশ্চিমা লিবারাল রাষ্ট্রগুলোও সংখ্যাগরিষ্ঠের সাংস্কৃতিক পরিবেশ রক্ষার্থে সংখ্যালঘুর ধর্মীয় স্থাপত্যের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপকে তাদের সভ্য রাষ্ট্রীয় নীতি মনে করে। অথচ, বাংলাদেশে যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুভূতি, স্থানীয় উত্তেজনা, আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তার যৌক্তিক প্রশ্নটি সামনে আসে, তখন এই সেকুলার বুদ্ধিজীবীরাই সেটিকে “সংকীর্ণতা” বা “মৌলবাদ” বলে উড়িয়ে দেন। এই চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা ও দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া সময়ের দাবি। ইউরোপে যা ‘সামাজিক সমঝোতা ও সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্য’, বাংলাদেশে মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা-ই কেন ‘উগ্রতা’ হিসেবে চিত্রায়িত হবে?

দ্বিতীয়ত, এই পুরো বিতর্কে ‘রাম’ বা ‘রাম-বিগ্রহ’ কোনো নিরীহ বা নিছক আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে হাজির হচ্ছে না। বাংলাদেশের সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে রাম কোনো ধর্মীয় চরিত্র হতেই পারেন, সেটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার প্রাত্যহিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় রামের নাম ও রাম-মন্দিরের ধারণা আর কোনো আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে আবদ্ধ নেই। প্রতিবেশী ভারতে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনে ভেঙে চুরমার করে সেখানে যে রাম-মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তা আজ বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়। বর্তমান ভারতে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানটি কোনো শান্তিময় ধর্মীয় বাণী নয়, বরং এটি সেখানে প্রকাশ্য রাজপথে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা, ভয় দেখানো, লাঞ্ছিত করা এবং রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আধিপত্য প্রদর্শনের একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ-হুংকারে পরিণত হয়েছে।

সে দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী শক্তি রামকে এমন এক উগ্র রাষ্ট্রীয়-সাংস্কৃতিক আইকনে রূপান্তরিত করেছে, যার মূল লক্ষ্যই হলো ভারতকে একটি মুসলিম-বিদ্বেষী একচেটিয়া হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা। এই ভয়াবহ ও রক্তাক্ত সমসাময়িক প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণ আড়াল করে, বাংলাদেশের একটি মুসলিম-প্রধান জনপদের প্রকাশ্য ও উন্মুক্ত স্থানে হঠাৎ অস্বাভাবিক বড় আকারের রামমূর্তি নির্মাণের তৎপরতাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিবেশী রাষ্ট্রে যে প্রতীকটি লক্ষ লক্ষ মুসলমানের রক্ত ও দীর্ঘশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের নির্মম চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই একই প্রতীক যখন বাংলাদেশের মাটিতে সার্বভৌম ক্ষমতার সমান্তরালে দানবীয় মূর্তিতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চায়, তখন এ দেশের তৌহিদী জনতার মনে তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত নাজুক, ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল সরল বন্ধুত্বের কূটনৈতিক ভাষায় পাঠ করা যায় না; এর ভেতরে সীমান্ত হত্যা, ফারাক্কা ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া, একতরফা বাণিজ্য সুবিধা, তীব্র রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ভারতের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার মতো বহুবিধ জটিল সমীকরণ জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ এবং সামগ্রিক উত্তরবঙ্গ অঞ্চলটি ভারতের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা-আলোচনায় বারবার একটি অতি-সংবেদনশীল ভূখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়, যা ভারতের কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেন নেক’ (ঈযরপশবহ’ং ঘবপশ)-এর অত্যন্ত সন্নিকটে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে কোনো সরল ও আবেগসর্বস্ব লিবারালিজমের চশমা দিয়ে পরিচালনা করা আত্মঘাতী।

রাষ্ট্রনীতি কেবল বিমূর্ত আইনি অধিকারের অন্ধ অনুকরণে চলে না; রাষ্ট্রকে প্রতিটি প্রতীকের ভেতরের রাজনীতি, সীমান্ত-নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী শক্তির দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক প্রজেক্ট বা এজেন্ডা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাংলাদেশের মাটিতে যদি এমন কোনো প্রতীক বা স্থাপত্য অতি-উৎসাহে বিশালাকারে গেড়ে বসার চেষ্টা করে, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রপ্রকল্প ও তাদের অখণ্ড ভারতের সাংস্কৃতিক এজেন্ডার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, তবে বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও সার্বভৌমত্বের পাহারাদাররা এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেলে তা কোনোভাবেই অমূলক নয়।

গাইবান্ধার এই রহস্যময় নাট্যের মূল কুশীলব ও কারিগর যিনি, তার জীবনবৃত্তান্ত ও অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে গা শিউরে ওঠে। এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী নামের এক ব্যক্তি, যার উত্থান অত্যন্ত রহস্যে ঘেরা। অনুসন্ধানে ও গোয়েন্দা নথিতে জানা যায়, ১৯৯১ সালে বগুড়ার শিবগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী এই হরিদাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীনই রহস্যজনকভাবে ভারতে পাড়ি জমায়। ধারণা করা হয়, ভারতের মাটিতে অবস্থানকালেই তার মধ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিশেষ দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। সেখান থেকে ফিরে এসে সে নিজেকে একজন সাধারণ এসি মেকানিক বা মেরামতকারী হিসেবে প্রকাশ করে। কিন্তু এই মেকানিকের পেশা কি কেবলই এক ছদ্মবেশ ছিল? ২০১০ সাল-পরবর্তী সময়ে এই হরিদাসের ভাগ্যে এক জাদুকরী ও অলৌকিক গতি আসে। এসি মেরামতের উসিলায় দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রাঙ্গণ ‘গণভবনে’ তার অবাধ যাতায়াতের পাস মিলে যায়। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণভবনের অন্দরে যাতায়াতের সুবাদে তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শেখ সেলিম এবং শেখ রেহানার সঙ্গে তার এক রহস্যময় সখ্য গড়ে ওঠে। একজন অতি সাধারণ মেকানিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এই অতি-ঘনিষ্ঠতা ও ব্যবসায়িক লেনদেন প্রমাণ করে, সে কেবল কোনো সাধারণ কারিগর ছিল না, বরং ক্ষমতার পর্দার আড়ালের এক ধূর্ত কুশীলব ছিল, যাকে কৌশলে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর অন্দরে প্রবেশ করানো হয়েছিল।

হরিদাসের এই অন্ধকার অতীতের এখানেই শেষ নয়। ২০১৪ সাল থেকে সে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম ভাঙিয়ে দেশব্যাপী এক ভয়াবহ প্রতারণার জাল বিস্তার করে। মুসলিম পরিচয় ধারণ করে ময়মনসিংহের এক সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করা এই হরিদাস পরবর্তীতে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ‘প্যারিস রিসোর্ট’ নামে এক বিলাসবহুল রিসোর্ট গড়ে তোলে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই রিসোর্টটি ছিল দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করার একটি অন্ধকার আখড়া, যেখানে গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করে জিম্মি করা হতো এবং বাংলাদেশের ভিআইপিদের ফাঁদে ফেলতে আন্তর্জাতিক ব্ল্যাকমেইলিং নেটওয়ার্কের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য মেলে। ২০২২ সালে এই প্রতারণার দায়ে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিল সে। কিন্তু সেই দাগী অপরাধী ও উগ্র মতাদর্শী হরিদাস জেল থেকে বের হয়েই রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যায় এবং পলাশবাড়ীতে সতেরো কোটি টাকার এই বিশাল মেগা প্রজেক্ট হাতে নেয়!

এই বিপুল অর্থের উৎস সম্পর্কে সে যে আষাঢ়ে গল্প ফেঁদেছে, তা খোদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বিস্মিত করেছে। হরিদাসের দাবি, সে নাকি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সবজি সরবরাহ করে একাই ৫ কোটি টাকা আয় করেছে! অথচ এই দাবির সপক্ষে কোনো বৈধ দলিল বা আয়কর নথি সে দেখাতে পারেনি। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, হরিদাসের আপন তিন ভাই- গোবিন্দ, গৌরাঙ্গ ও আনন্দ চন্দ্র দাস দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাস করছেন। আর পলাশবাড়ীর এই অতি-সুরক্ষিত ও সিসি ক্যামেরায় মোড়ানো দুর্গের মতো মন্দির কমপ্লেক্সটিতে প্রতিনিয়ত ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন যাতায়াত ছিল। এমনকি মূর্তি নির্মাণের কাজ স্থগিতের ঠিক পরপরই হরিদাসের এসি রুমে ঢাকা থেকে আসা কিছু তরুণের নিয়ে যে রুদ্ধদ্বার গোপন বৈঠক গোয়েন্দাদের নজরে এসেছে, তা এই পুরো ঘটনাকে একটি আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের দিকে নির্দেশ করে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে হরিদাসের এই সন্দেহজনক অর্থায়ন ও ভিনদেশী গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে গভীর তদন্তের সুপারিশ করেছে এবং দেশের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় হাইকমিশনের অনাকাক্সিক্ষত ও অতিরিক্ত কর্মকাণ্ডের পরিধি সীমিত করার জন্য সরকারের উচ্চমহলে জোরালো তাগিদ দিয়েছে।

অতএব, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর এই মূর্তিকাণ্ডকে কোনোভাবেই “মন্দিরের জমিতে মন্দির কর্তৃপক্ষ যা খুশি করবে”- এই সরল ও ঠুনকো লিবারাল বাক্যে বন্দী করে আড়াল করা যাবে না। রাষ্ট্র কোনো ল্যাবরেটরি বা বিমূর্ত তত্ত্বের পরীক্ষাগার নয় যে, সেখানে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে। রাষ্ট্র টিকে থাকে জীবন্ত মানুষের মনস্তত্ত্ব, ঐতিহাসিক স্মৃতি, ভয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আগ্রাসী রাজনীতি, সার্বভৌমত্বের অখণ্ডতা এবং সামাজিক ভারসাম্য ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশে হিন্দুসহ সকল ধর্মীয় সংখ্যালঘু নাগরিকরা জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে শান্তিতে বসবাস করবে; তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও মুসলিম সমাজ উভয়েরই নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতার আড়ালে, কোনো দাগী অপরাধী ও ভিনদেশী ইন্ধনপুষ্ট এজেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মুসলিম-বিদ্বেষী উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রকল্পের আগ্রাসী ছায়া ও প্রতীক বিশালাকারে মাথা তুলে দাঁড়াবে কি না; সেই প্রশ্ন তোলার পূর্ণ এবং ন্যায্য অধিকার বাংলাদেশের তৌহিদী জনতা তথা মুসলমানদের রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনতার এই যৌক্তিক উদ্বেগ ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানকে কোনোভাবেই ‘মৌলবাদ’ বা ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। বরং একে দেখতে হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আত্মরক্ষা, সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র পাহারা এবং একটি স্বাধীন জাতিসত্তার ন্যায্য রাজনৈতিক সচেতনতা হিসেবে। সরকারের উচিত, এই ছদ্মবেশী চক্রের নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করে দেশের শান্তি ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:

* প্রশাসনিক সূত্র: রংপুর বিভাগীয় প্রশাসন ও স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ সভার কার্যবিবরণী ও প্রেস ব্রিফিং (জুন, ২০২৬)।

* গণমাধ্যম: দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং উত্তরবঙ্গের স্থানীয় সংবাদপত্রের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

* তদন্ত ও গোয়েন্দা নথি: হরিদাস তরণীর অপরাধের খতিয়ান (র‌্যাব-২০২২), সাম্প্রতিক সন্দেহভাজন লেনদেন ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত গোয়েন্দা সারাংশ।

* আন্তর্জাতিক আইনি নজির: ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধর্মীয় স্থাপত্য ও আজান সম্প্রচার সংক্রান্ত নীতিমালা (সুইজারল্যান্ডের মিনার নিষেধাজ্ঞা আইন-২০০৯ ও পশ্চিমা মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট)।

* মাঠপর্যায়ের তথ্য: ‘মাসিক মুঈনুল ইসলাম’ প্রতিনিধি দলের সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম, শিক্ষক- জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।


এ জাতীয় আরো খবর...