শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

পবিত্র আশুরা আজ: ত্যাগের মহিমায় রক্তিম স্মৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

আজ শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, পবিত্র ১০ই মহররম। রক্তঝরা কারবালার সেই বিষাদময় স্মৃতি আর সত্যের পথে অটল থাকার শপথ নিয়ে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে পবিত্র আশুরা। হিজরি ৬১ সনের এই দিনে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি কেবল একটি শোকের দিন নয়, বরং এটি জুলুম, অন্যায় এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তোলার এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার প্রতীক। বাংলাদেশেও যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

কারবালার ঘটনা কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল ন্যায় ও অন্যায়ের এক অসম লড়াই। এক প্রান্তে ছিল ন্যায়ের প্রতীক ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর অল্প কয়েকজন অনুসারী, অন্যদিকে ছিল ইয়াজিদের বিশাল বাহিনী। ইমাম হোসাইন (রা.) জানতেন যে, তিনি যদি ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার না করেন, তবে তাঁকে প্রাণ দিতে হবে। কিন্তু তিনি সত্যের সাথে আপস করতে অস্বীকার করেন। পরিবার-পরিজনসহ চরম তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ফোরাত নদীর তীরে তপ্ত বালুচরে যে আত্মত্যাগ তিনি করেছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে আছে। এই বিয়োগান্তক ঘটনা আজও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়, চোখে পানি নিয়ে আসে প্রতিটি সত্যপিপাসুর।

মুয়াবিয়া ২০ বছর খলিফা হিসাবে রাষ্ট্র পরিচালনার পর হিজরি ৬০ সালে ইন্তেকাল করেন। তার ইন্তেকালের পর ইয়াজিদ অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। ইয়াজিদ ছিল নিষ্ঠুর, মদ্যপ ও দুষ্ট প্রকৃতির লোক। এ কারণে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ তাকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি।

পক্ষান্তরে মদিনা ও কুফার জনগণ ইমাম হোসাইন (রা.)-কে খলিফা হিসাবে দেখতে চেয়েছে। এরই মধ্যে এক সময় কুফার লক্ষাধিক মানুষ ইমাম হোসাইন (রা.)-কে পত্র প্রেরণ করেন। এ পত্রে তারা দাবি জানান, সুন্নাহ পুনর্জীবিত এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অবিলম্বে তার দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন।

যদিও এ সময় হজরত হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইরাক থেকে চলে গিয়ে মক্কা-মদিনায় অবস্থান করছিলেন। মদিনায় অবস্থানরত সাহাবিরা এবং ইমাম হোসাইনের আপনজনরা এ সময় ইমামকে কুফায় যেতে বারণ করেন।

কারণ তারা আশঙ্কা করছিলেন, ইয়াজিদের পক্ষ থেকে বাধা এলে ইরাকবাসী ইমাম হোসাইনের পক্ষ ত্যাগ করবে।

কুফাবাসীর ডাকে সাড়া দিয়ে হজরত হোসাইন (রা.) তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে ইরাকের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠান। আর বলে দেন, যদি সে পরিস্থিতি অনুকূল দেখে এবং ইরাকবাসীর অন্তর সুদৃঢ় ও সুসংহত মনে হয়, তাহলে যেন তার কাছে দূত প্রেরণ করে।

মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে ১৮ হাজার কুফাবাসী তার কাছে এসে ইমাম হোসাইনের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করে এবং তারা শপথ করে বলে, অবশ্যই আমরা জানমাল দিয়ে ইমাম হোসাইনকে সাহায্য করব। তখন মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাছে পত্র পাঠিয়ে জানান যে, কুফার পরিস্থিতি সন্তোষজনক, তিনি যেন আগমন করেন।

ইয়াজিদের বিরুদ্ধে কুফাবাসীর সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে হজরত হোসাইন (রা.) তার পরিবারের ১৯ জন সদস্যসহ প্রায় ২০০ অনুচর নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন। জিলহজ মাসের ৮ তারিখে ইমাম হোসাইন (রা.) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন।

এ খবরে ইয়াজিদ উত্তেজিত হয়ে কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশির (রা.)-কে পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার দায়িত্ব প্রদান করে। ইমাম হোসাইন (রা.) যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে সে নির্দেশও দেয় পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ।

ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইন (রা.)-কে প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে।

পরিবার ও সঙ্গীদের নিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে পৌঁছলে ইবনে জিয়াদের বাহিনী তাদের অবরোধ করে ফেলে এবং ফোরাত নদীতে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে পানির হাহাকার শুরু হয়ে যায়।

এ সময় হজরত হোসাইন (রা.) তাদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, ‘আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি, এমনকি ক্ষমতা দখল আমার উদ্দেশ্য নয়। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদের যেতে দাও, আমরা মদিনায় ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। অন্যথায় ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি।

কিন্তু হজরত হোসাইন (রা.)-কে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয় ইবনে জিয়াদ। ঘৃণাভরে এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন ইমাম হোসাইন (রা.)।

মহররমের ১০ তারিখ সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে প্রায় ৪ হাজার ইয়াজিদ বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। ইমাম হোসাইন (রা.) সাথিদের নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এ যুদ্ধে একমাত্র ছেলে হজরত জয়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও নারীসহ সবাই একে একে শাহাদতবরণ করেন।

মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহিদ করা হয়। সীমার নামক এক পাপিষ্ঠ তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

শাহাদতের পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক বর্শা ফলকে বিদ্ধ করে এবং তার পরিবারের জীবিত সদস্যদের দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে প্রেরণ করা হয়। ইমামের খণ্ডিত মস্তক দেখে ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পরে।

বলাবাহুল্য যে, কারবালার প্রান্তরে সে অশুভ দিনে পাপিষ্ঠরা যে নির্মমতা ও নির্দয়তার পরিচয় দিয়েছে, তা পাষণ্ড হৃদয়েও ব্যথার সৃষ্টি করে।

শাহাদাতের পর হজরত হোসাইন (রা.)-এর দেহ মোবারকে মোট ৩৩টি বর্শা ও ৩৪টি তরবারির আঘাত দেখা গিয়েছিল। শরীরে ছিল অসংখ্য তীরের জখমের চিহ্ন। এ অসম যুদ্ধে একমাত্র ছেলে হজরত জয়নুল আবেদিন (র.) ছাড়া ৭০ থেকে ৭২ জন শহিদ হন।

ইয়াজিদের এ জয়লাভ বেশি দিন টিকে থাকেনি। মাত্র চার বছরের মধ্যে ইয়াজিদের মৃত্যু হয়। এর কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয় তার পুত্রের। কারবালার এ মর্মান্তিক হত্যায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যেই মুখতার সাকাফির বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। এরপর ইয়াজিদের বংশের কেউ শাসন ক্ষমতা লাভ করেনি।

ইমাম হোসাইন (রা.) আজও সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসাবে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়রাজ্যে বেঁচে আছেন। ইসলামের জন্য তার আত্মত্যাগ যুগের পর যুগ মুসলিম উম্মাহ্ শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে স্মরণ করবে।

পবিত্র আশুরার তাৎপর্য কেবল কারবালার ট্র্যাজেডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। ঐতিহাসিকভাবে ১০ই মহররমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সৃষ্টির অগণিত বিস্ময়কর ঘটনা। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং কিয়ামতও এই দিনেই সংঘটিত হবে। এছাড়া হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে আগমন, হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি এবং হযরত মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই পবিত্র আশুরা। রাসূল (সা.) মদিনায় হিজরতের পর ইহুদিদের মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখতে দেখে মুসলমানদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই এই দিনে রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশে আশুরা পালনের ক্ষেত্রে শিয়া সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা মহানগরীতে প্রধানত পুরান ঢাকার হোসেনি দালান থেকে শোকের মিছিল বা ‘তাজিয়া’ বের করা হয়। প্রতিবছরই এই দিনকে ঘিরে শিয়া ধর্মাবলম্বীরা বর্ণাঢ্য অথচ শোকাবহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা কালো পোশাক পরিধান করে, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর স্মরণে শোকাতুর হৃদয়ে অংশ নেন। তারা বিভিন্ন শোকসংগীত এবং মার্সিয়া পাঠের মাধ্যমে কারবালার ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিয়া ধর্মাবলম্বীরাও স্থানীয়ভাবে নানা ইবাদত, দোয়া মাহফিল ও তবারক বিতরণের আয়োজন করেন।

দিবসটিকে ঘিরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাজিয়া মিছিলের রুটগুলোতে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। ডিএমপির বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মিছিলে দা, ছোরা, কাঁচি, বর্শা, বল্লম, তরবারি, লাঠিসহ কোনো প্রকার ধারালো ও আঘাতজনিত সরঞ্জাম বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অতীতে কিছু ক্ষেত্রে মিছিলে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার করে শরীর রক্তাক্ত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল, যা অনেক সময় জননিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই বিধিনিষেধের মূল লক্ষ্য হলো যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়ানো এবং উৎসব ও শোকের দিনটিকে শান্তিপূর্ণ রাখা। এছাড়া আতশবাজি ও পটকা ফোটানোও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, আশুরা কেবল শোক প্রকাশের দিন নয়। শোকের নামে বাড়াবাড়ি বা শরীর রক্তাক্ত করার কোনো অবকাশ ইসলামি শরিয়তে নেই। অনেক সময় অজ্ঞতাবশত মানুষ কারবালার শোকে নিজেকে আঘাত করে, যা আলেম সমাজ বরাবরই নিষেধ করে আসছেন। তাদের মতে, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ত্যাগের আসল শিক্ষা হলো ন্যায়ের পথে অটল থাকা, অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং ধৈর্য ধারণ করা। শোকের দিনটিতে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দোয়া-দরুদ পাঠ এবং গরিব-দুঃখীদের দান-খয়রাত করাই প্রকৃত সওয়াবের কাজ। ইসলামি স্কলাররা মুসলিম উম্মাহকে কারবালার ত্যাগের শিক্ষাকে ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আজকের এই ১০ই মহররম আমাদের শেখায় কীভাবে সব বাধা জয় করে সত্যের পথে চলতে হয়। আজকের এই দিনে কারবালার শোকাতুর পরিবেশে আমাদের মনে রাখতে হবে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সেই অমোঘ বাণী—‘মৃত্যু নয়, অপমান সহ্য করাই হলো প্রকৃত পরাজয়।’ বর্তমান পৃথিবীতে যখন জুলুম ও অবিচারের মাত্রা বাড়ছে, তখন কারবালার শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চাই হোক এবারের আশুরার মূল শিক্ষা। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আজ ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করছেন এবং বিশ্বের সকল মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে পরম করুণাময়ের দরবারে প্রার্থনা করছেন। এই আশুরা আমাদের হৃদয়ে সত্যের আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলিত করুক—এই প্রত্যাশা সবার।


এ জাতীয় আরো খবর...