মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেল এবং এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছে সরকার। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কেবল জ্বালানি তেল ও এলএনজি চড়া দামে আমদানি করে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করার কারণে সরকারকে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে শুধু তেল আমদানিতেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি টাকা লোকসান হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। এই পরিস্থিতির পর নতুন করে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনা বাংলাদেশকে আবারও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গত মার্চ মাস থেকে কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি বাংলাদেশকে এলএনজি সরবরাহ করছে না। বাধ্য হয়ে পেট্রোবাংলাকে এখন সম্পূর্ণভাবে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতেও স্পট মার্কেটের ওপরই নির্ভর করতে হবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেল ও এলএনজির দাম নিশ্চিতভাবে বাড়বে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য চরম উদ্বেগের। গত মাসে সাময়িক যুদ্ধবিরতির কারণে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ২৮ ডলার থেকে কমে ১৬-১৭ ডলারে নেমে এসেছিল। কিন্তু রুটটি বন্ধ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে, গত শুক্রবার বিশ্ববাজারে ব্র্যান্ড ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৭৬.১০ ডলারে বিক্রি হলেও যুদ্ধকালীন সময়ে এর দাম ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আজ সোমবার আন্তর্জাতিক বাজার খোলার পর তেলের প্রকৃত দর কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তবে এই সংকটের মাঝেই আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘জি-টু-জি’ (সরকার টু সরকার) প্রক্রিয়ায় ১৬ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল) কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করে রেখেছে সরকার। গত ২০ জুন সিঙ্গাপুরে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের উপস্থিতিতে ১০টি সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে ভারতের আইওসিএল কোম্পানি প্রথম ৯.৫ ডলার প্রিমিয়ামে (জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য খরচ) তেল দিতে রাজি হলে পরবর্তীতে ইউনিপেক ও পেট্রো চায়নাসহ আরও ৪-৫টি কোম্পানি একই দরে তেল সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত উন্মুক্ত দরপত্রে যেখানে প্রিমিয়াম দিতে হয়েছিল সাড়ে ১৩ ডলারের বেশি, সেখানে এই সমঝোতার ফলে দেশের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিবহণ খরচ বা প্রিমিয়াম সাশ্রয় হতে যাচ্ছে। বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, জি-টু-জি পদ্ধতিতে এই ১৬ লাখ টন তেল কেনার প্রস্তাব ইতিমধ্যে বিপিসি বোর্ডে অনুমোদিত হয়েছে এবং তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে এই তেল কিনতে সরকারের ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হতে পারে।
এদিকে আর্থিক সংকটের বিষয়ে বিপিসির কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, গত চার মাসে সরকার জ্বালানি তেলের ভর্তুকি বাবদ বিপিসিকে একটি টাকাও প্রদান করেনি। ফলে সংস্থাটি নিরুপায় হয়ে তাদের মেগা প্রকল্প ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি-২’ এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা টাকা তেল আমদানির বিলে খরচ করতে বাধ্য হয়েছে। ভর্তুকির অর্থ চেয়ে অর্থ বিভাগে বারবার চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো সাড়া মেলেনি। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ বা মজুদ যথেষ্ট সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। বিপিসির ডিপোগুলোতে বর্তমানে ৪ লাখ ১৪ হাজার টন ডিজেল মজুত আছে যা দিয়ে অনায়াসে ৩৪ দিন চলবে এবং অকটেনের মজুত আছে প্রায় ৪০ দিনের। এছাড়া চলতি মাসেই আরও ৮-১০টি ডিজেলবাহী জাহাজ দেশে আসার কথা রয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে ৩০ হাজার টনের একটি ডিজেলবাহী জাহাজের বিল যেখানে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে উঠেছিল, তা বর্তমানে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার আগেভাগেই দেশের সব ডিপোকে সতর্ক করা হয়েছে এবং জ্বালানি বিভাগ আশা করছে, আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল থাকলে এবার অভ্যন্তরীণ সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা হবে না।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর