শিরোনামঃ
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের সাংবাদিকতা পেশা নির্ধারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি : তথ্যমন্ত্রী ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি জনভোগান্তির মূল কারণ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না জুলাইয়ের বিচার : হামিদুর রহমান আযাদ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যা বললেন সালমান খান দিল্লি পুলিশকে ‘গুন্ডা’ বললেন নাসিরুদ্দিন শাহ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক অভিনেত্রী আয়েশা খান
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

হাসিনার মতোই কি ক্ষমতা হারাবেন মোদী

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ঢাকার ঐতিহাসিক শাহবাগ থেকে দিল্লির উত্তপ্ত যন্তর মন্তর—দূরত্ব কিংবা দুই দেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় পার্থক্য থাকলেও তরুণদের অধিকার আদায়ের ক্ষোভ যেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজপথে একই সূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শক্তিশালী শাসনের পতন ঘটিয়েছিল রাজপথের ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এবার ঠিক একই ধরনের তরুণ আন্দোলনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে। শিক্ষা ব্যবস্থার নজিরবিহীন দুর্নীতি, শীর্ষ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং প্রশ্নবিদ্ধ নীতিমালার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে সে দেশের জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম। ‘কক্রোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক ছাত্র ও যুব আন্দোলনের ডাকে দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর সরাসরি পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজকর্মীর এই অবস্থান এখন দিল্লির গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, যুক্তরাজ্যের লন্ডন কিংবা আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে প্রবাসী ভারতীয়রা রাজপথে নেমে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন, যা সাউথ ব্লকের নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক গভীর ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তরুণদের এই আন্দোলনের তীব্রতা মোদি প্রশাসনকে এতটাই বেকায়দায় ফেলেছে যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন নজিরবিহীন কড়াকড়ি জারি করেছে। বিক্ষোভকারীরা যেন ভারতের সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রা করতে না পারে, সে লক্ষ্যে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন একযোগে রাজধানীর ১৬টি অতি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে রাজধানী জুড়ে তীব্র যানজট ও নিত্যদিনের যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নিরাপত্তা জোরদারের দোহাই দিয়ে কেন্দ্রীয় ভবন ও প্রশাসনিক এলাকাগুলোতে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। দিল্লির সীমানায় বহিরাগত বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে সাঁজোয়া যান দিয়ে পথ আটকে রাখা হয়েছে। তবে প্রশাসনের এমন কড়া চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই আন্দোলনকারীরা অনড় অবস্থানে রয়েছে, যা নরেন্দ্র মোদির টানা তিন মেয়াদের ক্ষমতাসীন সরকারের শাসনব্যবস্থার ওপর নজিরবিহীন চাপ তৈরি করেছে।

পরিস্থিতি কেবল একটি পরীক্ষার অনিয়ম বা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মূলত ভারতের তরুণদের এই ক্ষোভের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট কাজ করছে। ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশটির বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানহীনতা বা বেকারত্ব এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মাথা ব্যথার কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এবং প্রান্তিক অঞ্চলের গণঅসন্তোষ। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশের হাজার হাজার কৃষক দীর্ঘদিন ধরে ভারত- মার্কিন কৃষি চুক্তির বিরুদ্ধে সীমানাজুড়ে রাজপথ অবরুদ্ধ করে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে দিল্লির প্রবেশদ্বারে চলছে আলাদা বিক্ষোভ। কৃষক, সাধারণ নাগরিক ও ছাত্রদের এই বহুমুখী আন্দোলন এখন বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের জন্য বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, রাজপথের তরুণ আন্দোলন কীভাবে একের পর এক অপরাজেয় বলে মনে হওয়া সরকারকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় ছাত্র-জনতার উত্তাল মহাসমুদ্রে ভেসে গিয়েছিলেন শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে অদম্য তরুণদের প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। এমনকি ২০২৫ সালে নেপালের রাজনৈতিক পটভূমিতেও যুব সমাজের বড় প্রভাব দেখা গেছে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দিল্লির বুকে হাজার হাজার তরুণের এই অবস্থান দেখে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে একই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পর এবার কি ভারতেও একই ধরনের সরকার উৎখাতের ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে? নরেন্দ্র মোদি কি শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পথেই হাঁটার ঝুঁকিতে পড়ছেন?

তবে ভারতের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটাই পৃথক এবং বেশ জটিল। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ, যার অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার আকার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বহুগুণ বড়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও এনডিএ জোটের সমর্থনে নরেন্দ্র মোদি শক্তভাবেই সরকার গঠন করেছিলেন। দল হিসেবে বিজেপির যে তৃণমূল স্তরের বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা এত সহজে ভেঙে পড়া কঠিন। উপরন্তু, প্রধান বিরোধী দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় ঐক্যের অভাব মোদি সরকারের জন্য একপ্রকার সুরক্ষাবলয় তৈরি করে রাখে। ফলে আন্দোলন তীব্র হলেও রাতারাতি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া ভারতে কিছুটা কঠিন বলেই ধারণা করা হয়।

এতসব প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির পরেও মোদি সরকার নিশ্চিতভাবেই বিগত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। ক্ষুব্ধ জেন-জি তরুণ সমাজ যখন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে, তখন যেকোনো শক্তিশালী শাসকের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে যে, তরুণদের ক্ষোভকে কেবল পুলিশ ও টিয়ারগ্যাস দিয়ে চিরতরে দমন করা যায় না। শেখ হাসিনাও আন্দোলনকে শুরুতে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই তরুণ সমাজই তার পতনের মূল শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। দিল্লির বর্তমান রাজপথের এই অনশন আন্দোলন হয়তো এখনই মোদি সরকারের পতন ঘটাবে না, তবে এটি মোদি প্রশাসনের একক কর্তৃত্বের গায়ে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ভারতের সরকার পরিবর্তনের মূল পথ নির্বাচন হলেও, তরুণদের রাজপথের এই ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ও দাবানল মোদি সরকারের বিদায়ঘণ্টার সঙ্কেত দিচ্ছে কিনা—তা আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথই ঠিক করে দেবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...