সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৭ অপরাহ্ন

খোকনের কবিতা এবং…

বাদল সৈয়দ / ১ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

লেখাটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। আপনার ভালো না লাগলে আগাম দুঃখ প্রকাশ করছি।
১) খোকন আমার বাল্যবন্ধু। একেবারে হরিহর আত্মা। দুই প্রতিবেশী পরিবারে আমাদের জন্ম একই বছর। সে অর্থে দুজনে মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় আমাদের পরিচয়।
২) আমাদের দুজনের ফুটবলের সাথে পরিচয় হয়েছিল একসঙ্গে।
৩) আমরা স্কুলে ভর্তি হই একই বছর।
৪) কিশোর বয়সে দুজনের প্রথম প্রেমের প্রচেষ্টাও একসঙ্গে।
৫) কলেজে ওঠার পর আমরা একসঙ্গে বিড়ি খাওয়া শিখেছিলাম। কলোনি হাসপাতালের নির্জন সিঁড়িতে বসে দুজনে বিড়ি টানতাম। খোকনের অদ্ভুত একটি গুণ ছিল। তা হলো, দেয়াশলাইয়ের আগুন জ্বালাতে তার ম্যাচবক্স দরকার হতো না। সে দেয়ালে ঘষা দিয়ে ম্যাচের কাঠি জ্বালাতে পারত।
৬) আমরা দুজন একই সময়ে কবিতা লেখা শুরু করি। কবিতা নিয়ে আমরা যে কত পাগলামি করেছি! একসময় কবিতা আমাকে ছেড়ে গেল—খোকনকে আঁকড়ে ধরল।
৭) আমাদের খুবই অদ্ভুত একটি অভ্যাস ছিল। আমরা দুজন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে রাত কাটাতাম। যেসব রোগীর অ্যাটেনড্যান্ট ছিল না, তাঁদের পাশে থাকতাম। কতজনের নিঃসঙ্গ মৃত্যু যে আমাদের চোখের সামনে হয়েছে!
৮) ১৯৮৮ সালে খোকন হঠাৎ জাপান চলে গেল! এরপর দিনের পর দিন আমি কান্না করে বালিশ ভিজিয়েছি।
৯) নব্বই দশকে খোকন তার জার্মান বউকে নিয়ে কয়েক বছর দেশে ছিল। আমিও তখন সদ্য বিয়ে করেছি। দুই নবদম্পতি তখন প্রায়ই একে অন্যের বাসায় রাত কাটাতাম। যে যার বাসায় যেতাম, সে তখন অন্যজনের জন্য নিজের বেডরুম ছেড়ে দিত।
১০) তবে গল্পগুজব শেষে আমাদের স্ত্রীরা ঘুমিয়ে পড়লেও আমরা দুই বন্ধু সারারাত বারান্দায় বসে থাকতাম। খোকন অনবরত কবিতা পড়ে যেত। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। খোকনের ঠোঁটে উচ্চারিত কবিতা বেয়ে ভোর নামত। তারপর আমরা ঘুমাতে যেতাম।
১১) এরপর খোকন জার্মানি চলে গেল। তখন যোগাযোগ তেমন সহজ ছিল না। তাই আমাদের যোগাযোগ আগের মতো রইল না। মাঝে মাঝে চিঠি—দুয়েকটা ফোন কল, এই পর্যন্ত। সেই চিঠিতে জানলাম, ২০০৫ সালে খোকন বাবা হয়েছে। কী আশ্চর্য! ঠিক এক মাস পর আমিও বাবা হলাম!
১২) ২০১০ সালে আমি প্যারিস গেলাম। সেখান থেকে খোকনকে ফোন করলাম। বললাম, ‘আমি পরশু জার্মানির ডুসেলডর্ফ আসব। তোর সাথে দেখা হতে পারে?’ ও বলল, ‘তুই ফ্রাঙ্কফুর্ট আমার বাড়িতে আয়।’
আমি বললাম, ‘দোস্ত, এবার সময় হবে না। ডুসেলডর্ফে মাত্র একবেলা থাকব। বিকেলে বেলজিয়াম চলে যাব।’
সে বলল, ‘তুই কোথায় উঠবি?’
‘কোথাও উঠব না। একবেলার মামলা।’
‘ঠিক আছে, সেখানকার ওই এলাকার অমুক রেস্টুরেন্টে দুপুর একটায় আমি আসব। তুই থাকিস।’
পরদিন খোকন যখন আমাকে জড়িয়ে ধরল, দেখলাম, ওর শরীর কাঁপছে। একটু পর পর তা কেঁপে উঠে। একবার ভাবলাম, ও কি অসুস্থ? কিন্তু জিজ্ঞেস করা করলাম না।
যতক্ষণ ছিলাম দেখলাম, ওর হাত কাঁপছে। মাঝে মাঝে শরীরও কাঁপছে।
বিকেলে যখন বিদায় নেব, ও ‘দোস্ত রে…’ বলে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল।
বুঝলাম, সে অসুস্থ না—কান্না চেপে রাখার চেষ্টায় এতক্ষণ কাঁপছিল।
১৩) ইদানীং আমার মনে হতো, খোকন স্থির হয়েছে। প্রতিষ্ঠা, প্রেমময়ী স্ত্রী, রাজপুত্রের মতো সন্তান ধীরে ধীরে দেশের মায়া কাটিয়ে তাকে থিতু করেছে। তাই সে কান্না লুকানোর জন্য আগের মতো কাঁপে না।
আজ বুঝলাম, এটি ছিল বড় ধরনের ভুল। কারণ খোকনের একটি কবিতা।
সে জার্মানিতে কবি হিসেবে পরিচিত। বাংলার পাশাপাশি জার্মান ভাষায়ও কবিতা লিখে। আজ সে একটি কবিতা পাঠিয়েছে। জার্মান ভাষায় লেখা। সে বাংলা অনুবাদ করে পাঠিয়েছে। এটি সে আজ ফ্রাঙ্কফুর্টে ইমিগ্রেন্টদের একটি সাহিত্য সম্মেলনে পড়বে।
কবিতার নাম ‘কর্ণফুলী থেকে মাইন।’
সে লিখেছে—
‘একটি স্যুটকেস, একটি পাসপোর্ট
আর বুকের ভেতর ভাঁজ করে রাখা একখণ্ড বাংলাদেশ
নিয়ে
যখন ফ্রাঙ্কফুর্ট এলাম
তখন জার্মানিতে গ্রীষ্মকাল চলছে।
আমার প্রিয়তমা স্ত্রী
আমাকে মাইন নদীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
মাইনের পাড়ে দাঁড়িয়ে
আমার শৈশবের নদী কর্ণফুলীর কথা মনে পড়ে গেল।
……………
……………
কর্ণফুলীর পাড়ে ফেলে এসেছি
কিছু অসমাপ্ত বিকেল
বৃষ্টিতে ভেজা মাটির গন্ধ,
কিছু প্রিয় মুখ
আমার মায়ের চুলের চেনা ঘ্রাণ…।’
এরপর আমি পড়তে পারলাম না।
চোখের সামনে ভেসে উঠল ডুসেলডর্ফের সেই দৃশ্য—‘দোস্ত রে…’ বলে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে খোকনের হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে যাওয়া।
১৪) আমি বুঝলাম, খোকন স্থির হয়নি। এখনো দেশের জন্য তার হাত কাঁপে, পুরো শরীর কাঁপে। কিন্তু সে তা গোপন করতে শিখেছে।
১৫) কী আশ্চর্য! এ লেখা শেষ করা মাত্র খোকন টেক্সট দিয়েছে—
‘দোস্ত, মাত্র কবিতা পড়া শেষ করলাম। আমি কাঁদতে কাঁদতে পাঠ করছি। সব দর্শক দাঁড়িয়ে হাত তালি দিছে। তারাও কাঁদছিল।’
অনেক বছর পর খোকনের জন্য আমি বালিশ ভিজিয়ে কাঁদলাম।
১৬) আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, সব প্রবাসীর কি খোকনের মতো মাতৃভূমির জন্য হাত কাঁপে? শরীর কাঁপে? কাঁপতে কাঁপতে তাঁরা কান্না লুকান?
***

#আসুন মায়া ছড়াই


এ জাতীয় আরো খবর...