বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারির সেই চূড়ান্ত বিস্ফোরণের ঠিক তিন দিন আগে, অর্থাৎ ১৮ই ফেব্রুয়ারি ছিল আন্দোলনের এক অগ্নিগর্ভ মোড়। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো দেশ যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল, তখনই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আন্দোলন দমনে জারি করে কুখ্যাত ১৪৪ ধারা।
১৯৫২ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের মিছিল ও বিক্ষোভ তুঙ্গে ওঠে। বিকেলের দিকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ আই সালাহউদ্দিন আহমেদ এক নির্দেশের মাধ্যমে ২০শে ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ঢাকা শহরে সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করেন। সরকারের এই ঘোষণা ছিল মূলত ২১শে ফেব্রুয়ারির জন্য পূর্বনির্ধারিত ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ও হরতাল কর্মসূচিকে নস্যাৎ করার একটি অপকৌশল।
১৪৪ ধারা জারির খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক হল এবং ঢাকা হলের (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল) ছাত্ররা তৎক্ষণাৎ স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বের করেন। তারা গগনবিদারী স্লোগান তোলেন— ‘১৪৪ ধারা মানি না’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ওই দিন সন্ধ্যায় বিভিন্ন হলে হলে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ছাত্ররা যেকোনো মূল্যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পরদিন অর্থাৎ ২০শে ফেব্রুয়ারি এবং চূড়ান্তভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি সফল করার শপথ নেন।
১৮ই ফেব্রুয়ারি রাতে আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকারের ১৪৪ ধারা জারির পর আন্দোলনে কৌশল কী হবে, তা নিয়ে নেতাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চলে। যদিও অনেক প্রবীণ নেতা আইনি জটিলতা এড়াতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কিন্তু ছাত্রনেতারা ছিলেন আপসহীন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে কোনো রক্তচক্ষু বা নিষেধাজ্ঞা তাদের দমাতে পারবে না।
১৮ই ফেব্রুয়ারির এই ১৪৪ ধারা জারি মূলত হিতে বিপরীত হয়েছিল। এটি স্তিমিত হতে যাওয়া আন্দোলনে নতুন করে ঘি ঢেলে দেয়। সাধারণ মানুষ ও ছাত্রদের মধ্যে জেদ তৈরি হয় যে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবেন না। এই দিনটির প্রস্তুতি ও ক্ষোভই ২১শে ফেব্রুয়ারি আমতলার ঐতিহাসিক জমায়েত এবং পরবর্তী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পথ প্রশস্ত করেছিল।
১৮ই ফেব্রুয়ারির সেই প্রতিরোধ ও সংকল্পই ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তস্নাত বিজয়ের প্রথম ধাপ, যা আজ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।