মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিশ্বজুড়ে একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— বিপদের এই মুহূর্তে তেহরানের তথাকথিত ‘বন্ধু’ চীন ও রাশিয়া নীরব কেন? কেন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা নৌবাহিনী ইরানের আকাশসীমায় ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো আবেগে নয়, বরং লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক আইনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের মাঝে: ‘অংশীদার’ (Partner) বনাম ‘মিত্র’ (Ally)।
কূটনৈতিক পরিভাষায় ইসরায়েলের আছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একজন ‘কৌশলগত অভিভাবক’ বা মিত্র। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া কেবল ‘কৌশলগত অংশীদার’।
ন্যাটো মডেল: ন্যাটোর আর্টিকেল-৫ অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে বাকিরা তাদের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য। ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটোভুক্ত না হলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’। ফলে ইসরায়েলের অস্তিত্বের সংকটে ওয়াশিংটন সরাসরি অস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ইরান মডেল: বিপরীতে, গত বছর রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের যে চুক্তি হয়েছে, তাতে সামরিক সম্পর্ক বাড়ানোর কথা থাকলেও ‘যৌথ প্রতিরক্ষা’র কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। অর্থাৎ, ইরান আক্রান্ত হলে রাশিয়া কেবল সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে পারবে বা পরামর্শ দিতে পারবে, কিন্তু সরাসরি সৈন্য পাঠিয়ে যুদ্ধ করতে আইনিভাবে বাধ্য নয়।
গত শনিবারের হামলার পর তেহরানের শীর্ষ কূটনীতিকরা মস্কোতে ফোন করলে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ কেবল ‘সহানুভূতি ও মৌখিক সমর্থন’ প্রকাশ করেছেন। পুতিন বা ল্যাভরভের নিন্দা কেবল বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিন সবসময়ই ‘বহুমেরু বিশ্ব’ গড়ার আস্ফালন দেখায়, কিন্তু যখনই তাদের কোনো বন্ধুদেশ আক্রান্ত হয়, তখন মস্কোর প্রতিক্রিয়া হয় লক্ষণীয়ভাবে দুর্বল। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত রাশিয়ার পক্ষে এখন নতুন করে ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামা প্রায় অসম্ভব।
চীনের ক্ষেত্রে সমীকরণটি আরও বেশি বাণিজ্যিক। ২০২১ সালে ইরানের সঙ্গে চীনের যে ২৫ বছর মেয়াদী ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে, তা মূলত একটি বাণিজ্যিক রূপরেখা। বেইজিংয়ের ভাষায় ইরান কেবল একজন ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার’।
তেল ও বাণিজ্য: ২০২৫ সালে ইরান যে তেল রপ্তানি করেছে, তার ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন। বেইজিং চায় সস্তায় জ্বালানি পেতে এবং ইরানের বাজারে নিজেদের পণ্য ঢোকাতে।
অনির্ভরযোগ্য অংশীদার: থিঙ্কট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের মতে, চীন সবসময়ই সামরিক ঝামেলা এড়িয়ে চলে। এর আগে ভেনেজুয়েলার সংকটেও চীন নিষ্ক্রিয় ছিল। বেইজিং আসলে ইরানকে একটি ‘লং গেম’ বা দীর্ঘমেয়াদী দাবার ঘুঁটি হিসেবে দেখে, যেখানে তাদের মূল লক্ষ্য বাণিজ্য, সামরিক বিজয় নয়।
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে গত ২৯ জানুয়ারি যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়ানো, যুদ্ধকালীন জোট গঠন নয়। চীন ও রাশিয়া উভয়েই জানে যে, ইরানের হয়ে যুদ্ধে নামা মানে হলো নিজেদের অর্থনীতিকে নতুন করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ফেলা। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কোনো দেশই নিজের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে অন্যের হয়ে মহাযুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন মিত্রশক্তি হলেও ২০২৬ সালের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন ওয়াশিংটন, মস্কো ও বেইজিং একে অপরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেখানে ‘ডি-ফ্যাক্টো’ মিত্রের পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে তেহরানের সঙ্গে মস্কো বা বেইজিংয়ের সম্পর্ক কেবল ‘পারস্পরিক স্বার্থের’।
ইরানকে নিয়ে রাশিয়া ও চীনের লক্ষ্য কেবল মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের প্রভাবকে সীমিত রাখা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা বা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে নারাজ। অর্থাৎ, এই ‘ত্রিশক্তি অক্ষ’ কেবল ততক্ষণই কার্যকর, যতক্ষণ কোনো ‘মহাযুদ্ধের’ ঝুঁকি তৈরি না হয়। হামলার মুখে ইরানের একাকীত্ব আবারও প্রমাণ করল— আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই, আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ।