একসময় যে মানসিক রোগটিকে ‘মানসিক ক্যানসার’ বলে ভুল করা হতো, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এই জটিল মানসিক ব্যাধিটির নাম সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তা, আবেগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং বাস্তবতা বোঝার শক্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এই রোগে ভুগছেন, যার মধ্যে আমাদের দেশেই রয়েছেন প্রায় ১৬ লাখ রোগী। ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি নিয়ে আজকাল আলোচনা হলেও, সিজোফ্রেনিয়ার মতো ভয়ংকর রোগটি নিয়ে সমাজে রয়ে গেছে চরম অজ্ঞতা ও কুসংস্কার।
সিজোফ্রেনিয়া রোগের প্রধান লক্ষণসমূহ সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: চিন্তার সমস্যা, অনুভূতির সমস্যা এবং আচরণের সমস্যা।
ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ডিলিউশন: রোগী অবাস্তব কিছুকে প্রবলভাবে বিশ্বাস করেন। যেমন- কেউ তাকে অনুসরণ করছে, খাবারে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে, কিংবা তার মনের কথা গোপন কোনো যন্ত্রের মাধ্যমে অন্যেরা জেনে যাচ্ছে। অনেকে নিজেকে বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত (যেমন- ফেরেশতা বা পীর) বলেও দাবি করেন।
অলিক প্রত্যক্ষণ বা হ্যালুসিনেশন: অস্তিত্ব নেই এমন কিছু দেখতে বা শুনতে পাওয়া। বিশেষ করে ‘অডিটরি হ্যালুসিনেশন’ বা গায়েবি আওয়াজ শোনা এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। আশপাশে কেউ না থাকলেও রোগী স্পষ্ট শুনতে পান যে কেউ তার সাথে কথা বলছে বা তাকে নিয়ে সমালোচনা করছে। এর ফলে রোগীরা অনেক সময় একা একা কথা বলেন বা বিড়বিড় করেন।
আচরণগত অস্বাভাবিকতা: কোনো কারণ ছাড়াই হাসা বা কাঁদা, হঠাৎ প্রচণ্ড উত্তেজিত হওয়া, গায়ের কাপড় সবার সামনে খুলে ফেলা, বাথরুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, কিংবা নিজের যত্ন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়া।
রোগের কারণ ও ঝুঁকির বিষয়গুলো সিজোফ্রেনিয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ আজও জানা যায়নি, তবে এটি মূলত একটি জৈব-রাসায়নিক এবং জিনগত সমস্যা। মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটারের (রাসায়নিক পদার্থ) অতিরিক্ত নিঃসরণ বা ভারসাম্যহীনতাই এই রোগের প্রধান কারণ। এছাড়া যদি মা-বাবার এই রোগ থাকে, তবে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। পাশাপাশি অতিরিক্ত মানসিক চাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা এবং মাদকাসক্তি (যেমন- গাঁজা বা ইয়াবা সেবন) এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগটি বেশি প্রকাশ পায়।
বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ও পরিবারের ভূমিকা সবার আগে প্রয়োজন কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা এবং অপচিকিৎসা (যেমন- ঝাড়ফুঁক বা অবৈজ্ঞানিক ঘরোয়া টোটকা) থেকে দূরে থাকা। সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। ব্রেইনের ডোপামিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ (যেমন- অলানজাপিন, রেসপেরিডন) সেবন করা বাধ্যতামূলক। অনেক সময় রোগী কিছুটা সুস্থ বোধ করলেই পরিবার নিজ থেকে ওষুধ বন্ধ করে দেয়, যা একটি মারাত্মক ভুল। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের মানসিক সমর্থন। রোগীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, পাগল বলে কটাক্ষ করা বা তার ওপর রাগ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, রোগীর অস্বাভাবিক আচরণগুলো তার ইচ্ছাকৃত নয়, বরং তার অসুস্থতার প্রকাশ।
কোথায় মিলবে চিকিৎসা? বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ এবং পাবনা মানসিক হাসপাতাল অন্যতম। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সিজোফ্রেনিয়ার উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিও একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারেন।