বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে একে অপরকে ধোঁকা দিয়ে আনন্দ পাওয়ার যে রীতি বিশ্বজুড়ে প্রচলিত, তার শেকড় কিন্তু বেশ গভীরে প্রোথিত। ক্যালেন্ডারের হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে প্রাচীন লোককথা—সব মিলিয়ে এই দিনটির জন্ম ও বিস্তারের পেছনে রয়েছে নানা চমকপ্রদ ঘটনা। নিছক কৌতুকের এই দিনটি কীভাবে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে রয়েছে নানা মতভেদ।
১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি যখন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন, তখন নববর্ষের দিনটি চলে আসে পহেলা জানুয়ারিতে। কিন্তু তখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ধীর। ফলে অনেকেই এই পরিবর্তনের খবর না জেনে পুরোনো রীতি অনুযায়ী মার্চের শেষ বা এপ্রিলের শুরুতেই নববর্ষ উদযাপন চালিয়ে যান। যারা নতুন নিয়মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, তারা এই পিছিয়ে থাকা মানুষদের উপহাস করতে শুরু করেন। ফ্রান্সে তাদের পিঠে কাগজের মাছ আটকে দিয়ে বোকা বানানোর একটি অদ্ভুত রীতি চালু হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘এপ্রিল ফিশ’। মূলত বসন্তের শুরুতে বোকা মাছের সহজেই জালে ধরা পড়ার বিষয়টিকে এখানে প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করা হয়েছিল। আর এই ক্যালেন্ডার বিভ্রাটকেই বিশ্বজুড়ে বোকা বানানোর দিনটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে ধরা হয়।
তবে কেবল ফ্রান্সের ক্যালেন্ডার পরিবর্তনই নয়, প্রাচীন রোমের সংস্কৃতিতেও এমন উৎসবের খোঁজ মেলে। মার্চের শেষদিকে সেখানে ‘হিলারিয়া’ নামের একটি উৎসব পালিত হতো, যেখানে মানুষ ছদ্মবেশ ধারণ করে একে অপরকে বিভ্রান্ত করত। আবার অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, বসন্তের শুরুতে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা বা হঠাৎ বদলে যাওয়া আবহাওয়া মানুষকে বোকা বানায়, যা থেকেই এমন রীতির উৎপত্তি। ইংরেজি সাহিত্যের আদি পুরুষ জেফরি চসার তার বিখ্যাত ‘দ্য ক্যান্টারবুরি টেলস’ কাব্যে ৩২শে মার্চ বলে একটি রূপক তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন। অনেক গবেষক একেই এই দিনটির প্রাচীন সাহিত্যিক রূপ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।
আমাদের এই উপমহাদেশে, বিশেষ করে মুসলিম সমাজের মধ্যে পহেলা এপ্রিল নিয়ে একটি মর্মান্তিক লোককথা বেশ গভীরভাবে প্রচলিত। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ১৪৯২ সালের এই দিনে স্পেনের রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলা মুসলিমদের একটি মসজিদে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে পরে সেখানে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারেন। তবে ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দেয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো, ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি স্পেনের শেষ মুসলিম শাসক বোয়াবদিল আত্মসমর্পণের মাধ্যমে গ্রানাডার পতন ঘটে। পহেলা এপ্রিলের কথিত সেই অগ্নিকাণ্ডের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এটি মূলত হারানো ঐতিহ্যের বেদনা এবং আবেগ থেকে সৃষ্ট একটি বানোয়াট মিথ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও যদি দেখা যায়, তবে কেবল নিছক আনন্দের জন্য মিথ্যা বলা বা কাউকে প্রতারিত করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আধুনিক যুগে এসে এই দিনটি আর কেবল সাধারণ মানুষের কৌতুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি কর্পোরেট দুনিয়ার বিপণন এবং ভাইরাল মার্কেটিংয়ের বড় একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ১৬৯৮ সালে লন্ডনে সিংহের গোসলের ভুয়া খবর কিংবা ১৯৫৭ সালে বিবিসির সম্প্রচারে গাছ থেকে নুডলস পাড়ার মতো বিখ্যাত সব রসিকতা বিশ্ববাসী দেখেছে। তবে ডিজিটাল যুগে এসে এই নিছক রসিকতা অনেক সময় মারাত্মক আইনি ও আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ২০১৮ সালে ইলন মাস্কের দেউলিয়া হওয়ার একটি ভুয়া টুইটের জেরে টেসলার শেয়ারের দাম সাত শতাংশ পড়ে যায়। আবার একটি রেস্টুরেন্ট টয়োটা গাড়ির বদলে টয় ইয়োডা পুতুল উপহার দিয়ে বিশাল জরিমানার মুখে পড়ে। বর্তমানের ফেক নিউজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই বোকা বানানোর খেলা আরও বিপজ্জনক। ২০২৫ সালে এআই সিস্টেম একটি পুরোনো কৌতুককে সত্য খবর হিসেবে প্রচার করে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ডিজিটাল দুনিয়ায় সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কতটা কঠিন। তাই হাস্যরসের আড়ালে মিথ্যা যেন আমাদের বাস্তব জীবনে কোনো বড় ক্ষতি করতে না পারে, সেদিকে সবার সচেতন হওয়া জরুরি।