দেশে বর্তমানে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এই অতি সংক্রামক রোগের হাত থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে এর প্রাথমিক লক্ষণ, ছড়ানোর মাধ্যম এবং টিকাদান সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রতিটি অভিভাবকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী হামের বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে শিশুদের মোট দুটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজটি দেওয়া হয় শিশুর ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজটি দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ৯ মাসের আগে শিশুরা হাম বা মিজলস ভাইরাসে আক্রান্ত হবে না—এমনটি ভাবার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সিয়াম মোয়াজ্জেমের মতে, যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি, বিশেষ করে যাদের বয়স ১৫ মাসের কম, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সাধারণত বুকের দুধ পানের মাধ্যমে শিশুর শরীরে মায়ের কাছ থেকে প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু যেসব শিশু এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং বা পর্যাপ্ত বুকের দুধ পায় না এবং অপুষ্টিতে ভোগে, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল থাকে। ফলে তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।
হামের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ওঠা। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাটি হলো—র্যাশ ওঠার ৩ থেকে ৫ দিন আগেই শিশুর শরীরে হামের সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়। এই সময়ের মধ্যেই আক্রান্ত শিশু তার সংস্পর্শে আসা অন্য সুস্থ শিশুদের সংক্রমিত করে ফেলে। তাই হাম নিয়ন্ত্রণে র্যাশ ওঠার জন্য অপেক্ষা করলে অনেক দেরি হয়ে যায়।
ডা. সিয়াম জানান, হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা, শুকনো কাশি এবং কঞ্জাংক্টিভাইটিস (চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও চোখ থেকে পানি পড়া)। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের মধ্যে সাধারণ ঠান্ডা-জ্বরের মতো এসব উপসর্গ দেখা দিলেই বিষয়টিকে অবহেলা না করে দ্রুত সতর্ক হতে হবে।
হাম একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মিজলস ভাইরাসের মাধ্যমে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ছড়ায়। এটি মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে নির্গত জলকণা বা ‘রেসপিরেটরি ড্রপলেট’-এর সাহায্যে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি খুব সহজেই তার চারপাশের ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে সক্ষম।
হামের এই ভয়াবহ সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী করণীয়গুলো হলো:
শিশুদের মধ্যে জ্বর, কাশি বা সর্দির সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
অসুস্থ শিশুকে অন্য শিশু ও পরিবারের সুস্থ সদস্যদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখতে হবে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের কোনোভাবেই এই অবস্থায় স্কুলে পাঠানো যাবে না।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের হাঁচি-কাশির সঠিক শিষ্টাচার শেখাতে হবে। হাঁচি বা কাশির সময় অন্যদিকে মুখ ঘোরানো, পরিষ্কার রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করা এবং বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।